
।। সেলিম জাহান।।
ঈদ উল আজহা উৎসব ও আনন্দের এবং উদযাপনের, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই আনন্দ এবং উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, যা জন্ম দিয়েছে ঈদ উল আজহার একটি অর্থনীতির। সে অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নানান ব্যক্তিবর্গ এবং নানান কাজকর্ম জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সে সব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পুরোটা সুষম বা সমতাভিত্তিক, এমনটি বলা যাবে না। বরং সেগুলোর স্পষ্ট একটি বৈষম্যের দিকও আছে। উদযাপনের আনন্দে আমরা নানান সময়ে ঈদ উল আজহার বৈষম্যের দিকটা ভুলে যাই।
কোরবানীর ঈদের অন্যতম ব্যয় হচ্ছে কোরবানীর পশুক্রয়। এটি ঐ ঈদের একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল দিক। এবং সবচেয়ে দু:খজনক ব্যাপার হচ্ছে যে কোরবানীর অন্তর্নিহিত মর্মার্থ না বুঝে অনেক মানুষই উচ্চমূল্যে পশুক্রয়ের একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামেন। ফলে বাজারে পশুর মূল্য চড়্ চড়্ করে বাড়তে থাকে। উচ্চতম মূল্যে পশু ক্রয়ের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যারা নামেন, তারা ভুলে যান যে, অসমতার কত বিরাট নগ্ন প্রকাশে তারা নেমেছেন। এর সূত্র ধরেই দেখা যায় যে, বাজারে কেউ কেউ কোটি টাকার গরু কিনছেন, আবার কাউকে কাউকে গরুর ভাগ কিংবা একটি খাসি কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে, আকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকার কারণে বহু মানুষ বাজারে পশুর হাটে প্রবেশাধিকার পায় না।
অসমতার সেই প্রকাশ শুধুমাত্র পশুক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রদর্শনীর মধ্যেও ব্যপ্ত হয়। পাড়ায় বা মহল্লায় প্রতিবেশীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় কার ক্রীত কোরবানীর পশু কত ভালো এবং দামী। এই ব্যাপারটি এক পর্যায়ে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই তুলনামূলক বিচারকালে বহু শিশুর ছোট হয়ে যাওয়া মুখ দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। একটি বৈষম্যের ধারণা তখনই শিশুমনে প্রোথিত হয়ে যায়।
কোরবানীর পশুক্রয়ের আরেকটি দিক হচ্ছে বাজারে পশুর যোগান। এই যোগানের একটি অংশ দেশের সীমান্তের বাইরে থেকে আসে – সুতরাং সেখানে একটি আমদানী প্রক্রিয়ার অর্থনীতি ও তার গতিময়তা জড়িয়ে থাকে। বহু ক্ষেত্রে সে পশুযোগান আসে চোরাপথে। সুতরাং কোরবানীর বাজারে পশু যোগানের ক্ষেত্রে একটি কালোবাজার ও চোরাকারবার গজিয়ে ওঠে। কোরবানীর পশুর যোগানের আর একটি উৎস হচ্ছে দেশজ। এবং এই যোগানের পেছনে একটি বিনিয়োগ এবং বছরব্যপী পরিচর্যার প্রক্রিয়া কাজ করে। যেমন, গ্রামীন কৃষকবঁধূরা স্বল্পমূল্যে একটি পশুশাবক কেনেন – কখনো নিজের জমানো অর্থ দিয়ে, কখনও ঋণ করে। তারপর এক বছর বঁধূটি এই শাবককে খাওয়ায়-দাওয়ায়, আদর-যত্ন করে, লালন-পালন করে। এক বছর পরে যখন পশুটি যখন বড়-সড় হয়, তখন সেটা উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়। কোরবানীর পশু যোগানের এই ব্যষ্টিক প্রেক্ষিতটি গ্রামীন অর্থনীতি এবং গ্রামের বহু পরিবারের কুশল বর্ধনের পেছনে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বহু বেসরকারী সাহায্য সংস্থার এ জাতীয় কর্মসূচী রয়েছে।
কোরবানীর ঈদের অর্থনীতির একটি বিরাট দিক হচ্ছে চামড়ার বাজার, বিশেষত: বিশ্ব বাজারে কোরবানীর পশুর চামড়া রপ্তানী। গত বছর বাংলাদেশ ১২২ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানী করেছিল। এরমধ্যে চামড়া রপ্তানী ছিল মাত্র ১২ কোটি ডলারের। কোরবানীর চামড়া সংগ্রহ করার সময়ে বহু চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। যদিও কাঁচা চামড়া রপ্তানীর ওপরে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালেই তুলে নিয়েছে, তবু মান সংরক্ষণ না করতে পারায় বহু কাঁচা চামড়ার রপ্তানী সম্ভাবনা নষ্ট হয়। অথচ ভিয়েতনামে দেশের চামড়া এবং চামড়াজাত রপ্তানীর মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে ১৯ গুণ বেশী। অথচ চামড়া সংরক্ষণের ব্যাপারে আরো বেশী মনোযোগী হলে কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানী থেকে আরো বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে।
কোরবানীর সময়ে কসাইদের চাহিদা বেড়ে যাই। এর মধ্যে পেশাজীবি নিয়মিত কসাইরা রয়েছেন, এবং অস্থায়ী অনিয়মিত কসাইরাও রয়েছেন। কসাইদের মজুরীভিত্তিক এই আয়-অর্থনীতিও ব্যাপ্ত। তবে তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে যে, অনিয়মিত ঋতুভিত্তিক কসাইদের অনভিজ্ঞতার কারণে বহু চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দেশে কি এ সব অনিয়মিত কসাইদের জন্যে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়?
কোরবানীর ঈদ উৎসব অর্থনীতির বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ঈদের কেনাকাটায়। ধনীরা যান প্রচন্ড রকমের আলোকিত, সুসজ্জিত বিপনীবিতানগুলোতে তাঁদের ঈদের বাজার করতে। অর্থ সেখানে ব্যয়ের সীমারেখা টানে না। তিনটে প্রত্যক্ষ ঘটনার কথা বলি। এক ঈদের কেনাকাটার সময়ে একটি বিপনীতে এক ভদ্রলোক দোকানীকে বললেন, ‘এক লাখ টাকার ওপরে যদি কোন লেহেঙ্গা থাকে, তা’হলে দেখান। তার কমের কিছু দেখানোর দরকার নেই’। কন্যার জন্যে কেনাকাটা করছিলেন তিনি। অন্য এক ঘটনায়, একটি সম্ভ্রান্ত বিপনী কেন্দ্রের আরও সম্ভ্রান্ততর একটি বিপনী থেকে লক্ষাধিক টাকার পোশাক-আশাক কেনার পরে এক ভদ্রমহিলা আর একটি দোকানে গিয়েছিলেন, তাঁর বাড়ীর গৃহকর্মীর জন্যে কাপড় কিনতে। দোকানী ৬০০ টাকার একটি পোশাক দেখাতে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন, ‘এতো দাম! ফতুর হয়ে যাবো যে।’ ‘আচ্ছা, ২০০ টাকার মধ্যে ঝি-চাকরদের দেয়ার মতো কিছু নেই আপনাদের দোকানে?’, জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তৃতীয় ঘটনাটির কথা বলি। একটি দোকানে একটি কিশোরী ঈদের দিনের জন্যে তিন প্রস্থ পোশাক কিনেছিলো – সকালবেলার জন্যে এক প্রস্থ, সেটা বদলিয়ে দুপুরে পরার জন্যে আরেক প্রস্থ, রাতের জন্যে আরেক প্রস্থ। তার ব্যাগ বহন করার জন্যে তার পাশে মলিনমুখে ময়লা কাপড় পরে দাঁড়িয়েছিলো প্রায় সমবয়সী আরেকটি কিশোরী। অনুমান করি ঐ বাড়ীর গৃহপরিচারিকা।
অন্যদিকে ঢাকা শহরে দরিদ্র মানুষেরা ঈদের কাপড় কেনেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে, নানান সেতুর ওপরে-নীচে, ফুটপাতের ওপরে বসা অস্থায়ী দোকানগুলোতে। সেখানে পুরোনো-নতুন কাপড় বিক্রি, দরদামের হাঁকাহাঁকি চলে, কি কিনতে চাই আর পকেটের রেস্ত কি, তা নিয়ে নীরব যুদ্ধ চলে। অনেক সময়ে ছেলেমেয়ের পোশাক কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। নিজেদের জন্যে কিছুই কেনা হয় না। বহু দরিদ্র পরিবারে অতীত ঈদের কাপড় দিয়ে বর্তমান ঈদ কাটানো হয়। ঈদের কেনাকাটার এও এক বাস্তবতা। সে বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয় ঈদের দিনের খাবারেও। একটুখানি সেমাই রান্না হলেই দরিদ্র পরিবারে খুশীর ঝিলিক দেখা যায়। একটা রঙ্গিন ফিতা, কিংবা ৬টা কাচের চুড়ি চোখে জল এনে দেয় কোন দরিদ্র পরিবারের কিশোরীর।
কোরবানীর ঈদের সময়ে কোরবানীর মাংসের জন্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্ভর করতে হয় ধনী গৃহাস্থলীর বদান্যতার ওপরে। বহু দুস্থ পরিবারে সারা বছরে ঐ একটা সময়েই মাংস খাওয়ার সুযোগ আসে। তবে কোরবানীর মাংস পাওয়াটাও এক বিরাট যুদ্ধ। বিত্তবান এলাকার বাড়ীর সামনে সকাল থেকেই বহু দু:স্থ দরিদ্র মানুষের ভীড় জমে যায়। তারপর কোরবানীর গোশত বিতরণের সময়ে কখনও কখনও কাড়াকাড়ি পড়ে যায়, মারামারি হয় – পুরো ব্যাপারটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। অ সময় মাংস-প্রার্থীরা কখনো কখনো হতাহতও হন। তাই, বিত্তবানদের বাড়ীর ভেতরে কোরবানীর মাংস দিয়ে যখন পোলাও খাওয়া হচ্ছে, তখন সে বাড়ীর ফটকের বাইরে ক’টুকরো গোশতের জন্য নিরন্ন মানুষের জনযুদ্ধ চলছে। বৈষম্যের এক বীভৎস চিত্র। ঈদের পরের দিন বহু বুভুক্ষু মানুষকে রাস্তার পাশের আবর্জনা ফেলার টিন ঘেঁটে বিত্তবানদের ফেলে দেয়া খাদ্যের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করতেও দেখা যায়। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে মাংস সংগ্রহই তো বড় কথা নয়, তা রান্না করার আনুসাঙ্গিক তেল-মসলার খরচও অনেকে জোটাতে পারেন না। বৈষম্যের এও এক দৃশ্যমান গল্প।
সুতরাং, যতই বলি না কেন যে, কেরবানীর ঈদ ভ্রাতৃত্বের, সৌহার্দ্যের, মিলনের, দেওয়ার চূড়ান্ত বিচারে, আমাদের সমাজ বাস্তবতায়, আমাদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে কোরবানীর ঈদের অর্থনীতির মধ্যে অসাম্যের এবং সামাজিক বৈষম্যের বীজ লুকিয়ে আছে। এই বৈষমের সব কিছু আমরা দূর করতে পারবো না, কিন্তু এর নগ্ন বহি:প্রকাশের দিকগুলোতো আমরা দূর করতে পারি আমাদের সংবেদনশীলতার মাধ্যমে? কাজটা সেখান থেকেই শুরু হোক না কেন?