তসলিমা নাসরিন
জন এফ কেনেডি যখন প্রেসিডেন্ট হন, তখনও বিতর্ক তুমুল ছিল। কারণ কেনেডি ক্যাথলিক ছিলেন। কেনেডির আগে কোনও ক্যাথলিক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হননি। সকলেই ছিলেন প্রোটেস্টান্ট। প্রোটেস্টান্টদের সংখ্যাই বেশি আমেরিকায়, ক্যাথলিকরা মাইনোরিটি। বারাক ওবামাও প্রোটেস্টান্ট। কেনেডির পর শুধু বাইডেন ছিলেন ক্যাথলিক। বাইডেনের ক্যাথলিক বিলিফ নিয়ে বিতর্ক হয়নি, কারণ তিনি প্রথম ক্যাথলিক প্রেসিডেণ্ট নন। প্রথম বারের পর মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায় ব্যতিক্রমকে মেনে নিতে। আজ জোহরান মামদানিকে সবাই প্রথম মুসলিম মেয়র বলছে, যেহেতু এর আগে কোনও মুসলিম নিউ ইয়র্কের মেয়র হননি। ঋষি সুনাককেও বলা হয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রথম হিন্দু প্রধানমন্ত্রী। ২০১৬ সালে সাদিক খান যখন লণ্ডনের মেয়র হয়েছিলেন, চারদিকে বলা হয়েছে লন্ডনের প্রথম মুসলিম মেয়র। প্রথম বার এমনই প্রচার হয়, যেহেতু পশ্চিমা দেশে মূলত খ্রিস্টানরাই হর্তাকর্তা। সত্তর দশকে নিউইয়র্কে প্রথম যখন ইহুদি ধর্মের একজন মেয়র হলেন , তখনও বলা হয়েছে নিউইয়র্কের প্রথম ইহুদি মেয়র। মামদানির পর কোনও হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের কেউ নিউ ইয়র্কের মেয়র হলে , বলা হবে নিউ ইয়র্কের প্রথম হিন্দু মেয়র, বা নিউ ইয়র্কের প্রথম বৌদ্ধ মেয়র। পৃথিবী বিবর্তিত হচ্ছে। মাইগ্রেশান বাড়ছে, পাশ্চাত্যের অচলায়তনগুলো ভেঙে পড়ছে।
জোহরান মামদানির বাবা মাহমুদ মামদানির পূর্ব পুরুষ গুজরাটের খোজা সম্প্রদায়ের বারো-ইমাম শিয়া। তাঁরা আফ্রিকায় মাইগ্রেট করেছেন ব্রিটিশ শাসনামলেই। মাহমুদ মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেছেন। রাজনীতির ওপর অনেক বইও লিখেছেন। না, তিনি কোনও ধর্ম মানেন না। জোহরান মামদানির মা মীরা নায়ার, হারভার্ড ডিগ্রিধারী, প্রেসটিজিয়াস পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনিও ধর্ম মানেন না। এমন দুজন নাস্তিক বুদ্ধিজীবীর ঘরে কোনও আস্তিকের জন্ম হওয়ার কথা নয়। আমার বিশ্বাস জোহরান মামদানি নিজেও বিশ্বাস করেন না ধর্মের এই রূপকথাটি, যে, নবী মুহম্মদের জামাতা আলীর বংশে জন্ম নেওয়া বারোজন ইমামকে স্বয়ং আল্লাহ ইমাম বানিয়েছেন, এবং বারো নম্বর ইমাম মুহম্মদ আল-মাহদির মৃত্যু হয়নি, আল্লাহ তাঁকে লুকিয়ে রেখেছেন, কেয়ামতের আগে তিনি উদয় হবেন এবং দুনিয়ায় শান্তি আনবেন! আমেরিকার মতো এত বড় দেশে একবিংশ শতাব্দিতেও কোনও রাজনীতিক বা প্রশাসনের কেউই নিজেকে নাস্তিক বলে পরিচয় দেন না। মাত্র একজন সংসদ সদস্য জারেদ হাফম্যান নিজেকে খ্রিস্টান না বলে মানববাদী এবং সংশয়বাদী বলেন, তারপরও নাস্তিক বলেন না। মাত্র দুজন, ক্যারোলিন উমফ্রে এবং সিসিল বথওয়েল, সিটি কাউন্সিল মেম্বার, নিজেদের নাস্তিক বলে পরিচয় দেন। আমেরিকা অত্যন্ত রক্ষণশীল দেশ। এক সময় ইউরোপ থেকে ছোট ছোট ধর্মীয় গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ ধার্মিক দ্বারা নির্যাতিত হয়ে আমেরিকায় এসে সেটল হয়েছে। আমেরিকায় ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সে কারণেই গুরুত্ব দেওয়া হত এবং এখনও হয়। আমেরিকায় ভাল এবং নীতিবান মানুষের সংজ্ঞায় ধার্মিক হওয়াকে ধরা হত, এবং এখনও হয়। যদিও বদলাচ্ছে সমাজ। কিন্তু খুব ধীরে। ইউরোপে একজন ঘোষিত নাস্তিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পা্রেন, কিন্তু আমেরিকায় পারেন না। আমেরিকায় খ্রিস্টান মন্ত্রী এবং মেয়রদের মধ্যে অনেকেই নাস্তিক, কিন্তু তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের হয়েও এখনও সর্বসমক্ষে বলতে পারেন না যে তাঁরা নাস্তিক। তাহলে কী সাহসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জোহরান মামদানি ঘোষণা করবেন যে তিনি নাস্তিক? অল্প বয়স, তার ওপর রাজনীতিক হিসেবে বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা নেই, আর তিনি কি না মেয়র পদে ভোট চাইছেন! খুব স্বাভাবিক ভাবেই উদবিগ্ন, ১০ লক্ষ মুসলমান ভোটকে নিশ্চিত করতেই সম্ভবত তিনি নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দিয়েছেন। ইহুদিদের মধ্যে যারা নাস্তিক, তারা নিজেদের কালচারালি ইহুদি বলে। মুসলমানদের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন মুসলমানের সংখ্যা অনেক, যারা কালচারালি মুসলমান। তারা যে ধর্মীয় ভাবে নাস্তিক, সেটা আজও প্রকাশ করার রীতি তৈরি হয়নি।
কিন্তু একদিন আসবে, নিশ্চয়ই আসবে, যেদিন ইমিগ্রেন্টদের দেশ আমেরিকায়, যারা নাস্তিক, তারা নিজেদের নাস্তিক বলে পরিচয় দিতে ভয় পাবে না বা সংকোচ করবে না। বাংলাদেশে নিজেকে নাস্তিক বলে ঘোষণা করলে তার কল্লা চলে যায়। আমেরিকায় কল্লা চলে যায় না, তবে মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ালে বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ালে ভোট পাওয়া যায় না। আমেরিকা নিশ্চয়ই একদিন আরও আধুনিক এবং প্রগতিশীল হবে, তখন নাস্তিকরা ভোটে দাঁড়ালে ভোট পাবে। ভোট পেতে হলে ধর্মবিশ্বাসী হওয়ার কোনও দরকার হবে না। ভোটে জিতে কে কী কী ভাল কাজ করবে, সেটিই জানা জরুরি হবে। বাংলাদেশের অসুস্থ নাগরিকরাও একদিন সুস্থ হবে, তখন কেউ নিজেকে নাস্তিক বলে ঘোষণা করলে কল্লা হারাতে হবে না, নির্বাসনে যেতে হবে না, মাথা উঁচু করেই স্বদেশে বাস করতে পারবে।
মামদানি সোশ্যালিজমে বিশ্বাস করেন। তিনি ধনী দরিদ্রের পার্থক্য ঘোচাতে চান। তিনি বর্ণবাদ এবং পুঁজিবাদ-বিরোধী বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। আমেরিকায় মুসলিমবিরোধী, সোশ্যালিস্টবিরোধী, ইমিগ্রেন্টবিরোধী লোকের সংখ্যা কম নয়। তাদের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও মামদানি ভোটে জিতেছেন। তাঁকে অভিনন্দন। কিন্তু তিনি ধর্ম গোত্র জাত বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মেয়র হবেন, এই আশা করছি। মুসলিম কট্টরপন্থীরা তাঁকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইলে যেন কিছুতেই ব্যবহৃত না হন। যেন তিনি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করেন।
