ইউনূস সরকারের সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্থর গতির কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় আরও ১৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বেড়েছে। শুধু বিনিময় হার সমন্বয়ের অজুহাতে এই বৃদ্ধি দেখানো হলেও, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন—মূল কারণ এখনকার সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়ার বিলম্ব ও কার্যক্রমে স্থবিরতা।
প্রকল্পটির প্রথম সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালের মূল অনুমোদনের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অপরিবর্তিত থাকলেও, টাকার দর কমে যাওয়ায় বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৪ কোটি টাকা।
অর্থাৎ কেবল ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন নয়, বরং প্রকল্প তদারকির গতি হ্রাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বও ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক সূত্র।
প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য ১১ নভেম্বর পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে—যা ইতিমধ্যেই একাধিকবার পিছিয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদও বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। অথচ মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালুর কথা ছিল। সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, এখন প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাবে ২০২৬ সালে—দুই বছর পিছিয়ে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের বিলম্বের জন্য করোনাভাইরাস মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলার সংকটের কথা বলা হলেও, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন—অন্তবর্তী সরকারের সময় আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখছে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে গতি ও আগ্রহ নিয়ে আগের সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়েছিল, এখন সেটি আর দেখা যাচ্ছে না। সিদ্ধান্তের জন্য ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকে।”
রূপপুর প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেয়া সবচেয়ে বড় ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি ছিল। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায় শুরুর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে অন্তবর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়—দুই-ই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রত্যাশা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
প্রকল্প সংশোধনের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা অবকাঠামো, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব খাতের যৌক্তিকতা থাকলেও, প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন—অনেক বরাদ্দই সময়ক্ষেপণের ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত খরচ।
উদাহরণস্বরূপ, প্রকল্পের সিডি-ভ্যাট খাতে বরাদ্দ ১৭৮ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩৭৮ কোটি টাকা করা হয়েছে। যানবাহন খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৬৭ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা। অফিস সম্প্রসারণ, সরঞ্জাম ক্রয় ও ওভারটাইম খাতেও নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে।
রুশ প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট নির্মাণ কাজ পরিচালনা করছে। এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭৪.২৪ শতাংশ। ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা সময়মতো সম্ভব হবে কি না—তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অন্তবর্তী সরকার বলছে, প্রকল্পের সংশোধন ও নতুন ব্যয় নির্ধারণ আন্তর্জাতিক মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের মূল ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও সময়মতো উৎপাদন শুরু করতে এখনই কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে, দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা দুর্বল হয়ে পড়বে।
