আওয়ামী লিগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রসংঘে দায়ের করা জরুরি আপিলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আগামী ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করার কথা ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের। হাসিনার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় বাংলাদেশের মহম্মদ ইউনুসের সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে।
এদিকে এই বিচারের ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে আইন ও বিচার মহল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলি। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না দ্য ওয়াল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই বিচার বেআইনি। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁর বিচার চলতে পারেনা। তাছাড়া ট্রাইবুনালে বিচার করা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন এই বিশিষ্ট আইনজীবী।
আওয়ামী লিগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রসংঘে দায়ের করা জরুরি আপিলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
লন্ডনের আইনজীবী স্টিভেন পাওয়েলস কেসি এবং তাতয়ানা ইটওয়েল হাসিনার পক্ষে জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিবেদক এবং বিচারবহির্ভূত, সংক্ষিপ্ত বা ইচ্ছামূলক মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিবেদকের কাছে জরুরি আপিল দায়ের করেছেন।
আপিলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারে ন্যায়বিচারের অধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)-এ চলছে।
আপিলে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ২০০৯ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি ও তাঁর দল আওয়ামী লিগ পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হন। গত বছর সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে রাজনৈতিক সহিংসতায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। ২০২৪-এর ৮ অগস্ট মহম্মদ ইউনুস একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন।
জুলাই ২০২৫-এ শেখ হাসিনা এবং আরও দুইজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে, যা ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্ট মাসে বিক্ষোভ দমনের সময় সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তার বিচার অনুপস্থিতিতেই (in absentia) চলছে। খুব শিগগিরই রায় ঘোষণার কথা এবং ধারণা করা হচ্ছে, তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
জরুরি আপিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে শেখ হাসিনার সরকারের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত কথিত অপরাধের পাশাপাশি পরবর্তীতে তাঁর সমর্থকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর প্রতিশোধমূলক হামলার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, আইসিটি শুধুমাত্র শেখ হাসিনার সরকারের সদস্যদেরই বিচারের আওতায় এনেছে। কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা করেছে—’যারা এই আন্দোলন সফল করেছে তারা ১৫ জুলাই থেকে ৮ অগস্ট পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনও বিচারের মুখোমুখি হবে না।’
আপিলটিতে বলা হয়েছে, আইসিটিতে চলমান বিচার একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপূর্ণ পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে একটি অনির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক বৈধতা-বিহীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এটি শেখ হাসিনার ন্যায়বিচারের অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের ইঙ্গিত। দেয়, যার মধ্যে রয়েছে:
* শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) ১৪(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল’-এর মাধ্যমে বিচার করা হয়নি।
* আইসিটির বিচারকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং তাদের বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ পক্ষপাতের আশঙ্কা তৈরি করে। এছাড়াও, প্রধান প্রসিকিউটরের নিরপেক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। কারণ তিনি প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার আওয়ামী লিগ নিষিদ্ধ করার দাবিতে রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিয়েছেন।
* শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধে অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার করা হচ্ছে। ভারতের কাছে তাঁর প্রত্যর্পণের অনুরোধ এখনও মুলতুবি থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়া তার অনুপস্থিতিতেই চলছে।
* তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে কোনও আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাননি। আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আওয়ামী লিগের সঙ্গে যুক্ত বা তাঁর পক্ষে আইনজীবীরা হামলার শিকার হয়েছেন এবং তারা নিরাপদে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এর ফলে, শেখ হাসিনাকে একজন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে, যাঁর সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ বা নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এমন গুরুতর ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘনের প্রেক্ষিতে, এই বিচারের পর যদি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তবে তা কার্যত একটি অন্যায্য এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, স্টিভেন পাওয়েলস কেসি এবং তাতিয়ানা ইটওয়েল, ডউটি স্ট্রিট চেম্বার্স, শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করছেন।
