“হে মাবুদ, তুমি বাংলাদেশের মুসলমানদের হাত থেকে ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করো।” এটা আমি প্রথম পড়ি কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা হিসেবে। এর কিছুদিন পর ইমতিয়াজ মাহমুদই জানান, এই একই ধরনের লেখা ইসলামী স্কলার মুসা আল হাফিজ, সাঈফ ইবনে রফিকসহ মধ্যযুগের বহু সুফি সাধকরা লিখেছেন, বলেছেন।
এই বিষয়টি খুব করে বোঝা যায় যদি আপনি স্থির হয়ে ভাবেন যে, দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি মুসলমান মারা গেছে কাদের হাতে? উত্তর হলো, মুসলমানদের হাতে মুসলমানরা মারা গেছে। পাকিস্তানের মুসলমানরা বাংলাদেশের মুসলমানদের ১৯৭১ সালে হত্যা করেছে। এই সংখ্যাটি দুনিয়ায় একক মুসলমান হত্যাকাণ্ড হিসেবে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বেশি। আপনি যতই কমাতে থাকেন যে পরিমাণ হবে, সেটাও দুনিয়ায় একক মুসলমান হত্যাকাণ্ড হিসেবে বেশি।
বাংলাদেশে মুসলমানের দাড়ি কাটে আরেক ‘ভালো’ মুসলমান, মুসলমানের লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয় আরেক ‘সহি’ মুসলমান। মুসলমান পীরের খানকা ভাঙে মুসলমানরা।
আবার বাংলাদেশে কিছু অর্বাচীন বলছে, মুসলমানদের শত্রু হলো হিন্দুরা। কী এক আজব ঘটনা।
তো, এত মাজার ভাঙার পর, এত পীরের খানকা ভাঙার পর, বাউলদের মাইরধর, প্রোগ্রাম বাতিল করার পর আমাদের নদীয়ার ভাবান্দোলনের গুরুর মনে হয়েছে, কাজটি খারাপ হইছে। তিনি নাকি গুরুতর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
খারাপ লাগলেও শোনেন, আমরা খুবই নিম্নবর্গের হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছি। মানে আমরা ছিলাম ডোম, চাড়াল, চণ্ডাল, মুচি, কোল, ভীম—মানে একদম অচ্ছুত। হিন্দু ব্রাহ্মণ তো দূরে থাক, ক্ষত্রিয় বৈশ্য দূরে থাক, আমাদের অনেকে শূদ্রও না। আমাদের অনেকে অবর্ণও আছে—মানে তারা সাঁওতাল আদিবাসী।
আমাদের কোনো অধিকার ছিল না। আমরা ছিলাম অচ্ছুত। আমরা রাজার বাড়ির সামনে দিয়ে, ব্রাহ্মণের বাড়ির সামনে দিয়ে, এমনকি বড় বড় ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতো পরে যাওয়ার অধিকারও ছিল না; যদিও হিসাব বলছে আমাদের জুতোই ছিল না। এরকম নিরন্ন হতদরিদ্র বঞ্চিত লাঞ্ছিত গরিব হিন্দু, কোল, ভীম, রাজবংশিরা মুসলমান হয়েছি। এই মুসলমান হওয়ার সময় দুনিয়ায় কোনো কওমি মাদ্রাসা ছিল না। এখানে কওমি মাদ্রাসার হাতে, ভারতের দেওবন্দি কোনো মাওলানা হুজুর আমাদের মুসলমান বানায়নি।
আমরা মুসলমান হয়েছি মায়েস্ত্রোর—মানে মহান শিক্ষকের কাছে। এই শিক্ষকরা পীর ছিলেন। তাদের কাছে আমরা বায়াত নিয়েছি।
আমরা আমাদের ফসল উঠার সাথে সাথে সেই ফসলের প্রথম কিছু অংশ আমরা পীরের কাছে দিয়েছি। পীরের সেই ফসল সংগ্রহ করেছেন মসজিদের ইমাম সাহেব। সারা বছরে ফসল জমে যে টাকা বা ধান হয়েছে সেটা দিয়ে ওরস হয়েছে, সেই ওরসে আবার নিরন্ন মানুষ খেয়েছে। এ যেন একটা সাইকেল—আমারই দান, আমারই কষ্টের শ্রমের ফসল আমারই নিরন্ন পেটে অন্ন জুগিয়েছে। আমরা এভাবে দিনের পর দিন কাটিয়েছি।
আমাদের গ্রামে অচেনা কেউ এলে আমরা তাকে মুসাফির হিসেবে নিয়েছি। তাকে খেতে দিয়েছি, থাকতে দিয়েছি। তার হোটেল লাগেনি, রেস্টুরেন্ট লাগেনি। সে ডাকাত হিসেবে আমাদের খুন করেও যায়নি। এই মহব্বত আমরা আমাদের মহান শিক্ষকের কাছে—পীরের কাছে—শিখেছি।
এসব কিছুই সংগঠিত পুঁজিবাদের কাছে বিলীন হয়েছে। এখন পীরের কাছে যায় না, কিন্তু মাওলানা সাহেব হোয়াটসঅ্যাপে ফুঁ দিয়ে দোয়া দিয়ে ব্যাংকে বা বিকাশে টাকা নেন। ফসলের সাথে কৃষকের যে মহব্বত, সেই মহব্বত–প্রেম গিয়ে পীর ও সাধারণ মানুষের সাথে মিলিত হতো—সেটা ব্যাংকিং গিয়ে, ফিনান্স ক্যাপিটালের মুনাফা বৃদ্ধি করছে। অবশ্য তারা এর নাম দিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকিং।
তো, আমরা এক প্রজন্ম ঢাকায় এসে সেই পীরের খানকা ভাঙার সমর্থন দিচ্ছি যে পীরের দরগায় বাপজান তার ফসলের প্রথম ভাগ দিয়ে আসতেন। আমরা আসলে আমাদের মহব্বতের মাথা তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলছি—এ যেন পিতার সাথে পুত্রের বিচ্ছেদ, এই বিচ্ছেদ গ্রামের সাথে এই সম্পর্ক আরও নিবিড়ভাবে পুঁজিবাদের সাথে। এর নাম আমরা ভিন্নভাবে ইসলাম দিয়েছি।
তো, আপনারা এর নাম ইসলাম দেন—আমাদের সমস্যা নেই। কিন্তু যদি সামান্য কিছু মানুষও আপনাদের তরিকায় শান্তি না পায়, আগের তরিকায় থাকতে চায়—তাদের আপনারা অপদস্ত, অপমান, মাইরধর করতে পারেন না। এটা জুলুম। এই জুলুম কইরেন না।
এই যে যারা এসব করছেন তারা কোনো কালে সাবঅল্টার্ন ছিলেন না, তারা সবসময় অন্যের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দিয়েছেন রাজ-কৌশলে। এর আগে আপনারাই শেখ হাসিনাকে কওমি মাতা বানিয়েছেন। আপনারা সবসময় রাজসভা অলঙ্কৃত করেছেন, আপনারা সবসময় শাসকদের পক্ষে থেকেছেন। আপনাদের কোনো ইতিহাস নেই যে, আপনারা কৃষকের ফসলের দামের জন্য, তার সারের জন্য, তার ভূমির জন্য লড়াই করেছেন। আপনাদের কোনো ইতিহাস নেই যে আপনারা শ্রমিকের জন্য লড়াই করেছেন। আপনাদের সব হুমকি–ধমকি রক্ষা করেছে রাজাকে।
এ দেশের প্রকৃত সাবঅল্টার্ন হলো কৃষক, শ্রমিক, পীর, ফকির, বাউল। এরপর আমেরিকানপন্থী কোনো কথিত ‘বাম’ যদি এই ইসলামো-ফ্যাসিস্টদের সাবঅল্টার্ন বলে চিহ্নিত করতে আসে, তাহলে এই দেশের সত্যিকার অর্থে নির্যাতিত–নিপীড়িত মানুষ এবার তাদের রুখবে। শুধু তাত্ত্বিকভাবেই রুখবে না, এবার মাঠের লড়াইও জোরদার রুখে দেবার সময় এসেছে।(সংগৃহীত)
