লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এই ঘটনা শুধু স্থানীয় নয়, সারা দেশে সার সংকটের একটা ছবি তুলে ধরেছে। গ্যাসের অভাবে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানির বিলম্ব, সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট এবং চড়া দামে কৃষকরা দিশেহারা। শীতকালীন ফসলের মৌসুমে এই সংকট ফসলের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
রবিবার (৩০ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে হাতীবান্ধা উপজেলার অডিটরিয়াম চত্বরের সামনে ‘মেসার্স মোর্শেদ সার ঘর’ বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা রাস্তায় নামেন। তারা অভিযোগ করেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কার্তিক বর্মনের সহযোগিতায় ডিলাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। ফলে ভুট্টা চাষের মৌসুমে সার না পেয়ে তারা বিপাকে পড়েছেন। একপর্যায়ে মহাসড়ক অবরোধ করে তারা ডিলার ও কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন। পরে হাতীবান্ধা ইউএনও শামীম মিঞা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাইখুল আরেফিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জেলায় কোনো সার সংকট নেই। মাসের শেষ দিকে বরাদ্দ কম থাকায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে, নতুন বরাদ্দ আসলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির মতো নন-ইউরিয়া সারের অভাবে তারা চড়া দামে কিনতে বাধ্য।
এই সংকট লালমনিরহাটে সীমাবদ্ধ নয়। সারা দেশে একই ছবি। উত্তরাঞ্চলে রংপুর, শেরপুর, পাটগ্রামসহ জেলায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। রংপুরে কৃষক আবু তালেব বলেন, “ভূমি প্রস্তুতি ছাড়া নন-ইউরিয়া সার পাওয়া যায় না। নভেম্বরে চাহিদা বাড়বে, কিন্তু স্টক যথেষ্ট না হলে ফসল কমবে।” রংপুরের বিএডিসি অতিরিক্ত পরিচালক বলছেন, স্টক আছে কিন্তু অসৎ ব্যবসায়ীরা প্যানিক তৈরি করছে।
দেশজুড়ে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিক) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) জানাচ্ছে, গ্যাসের অভাবে দেশীয় উৎপাদন কমেছে। বার্ষিক ৩-৩.২ মিলিয়ন টন ইউরিয়ার চাহিদায় ১.৬-২.১ মিলিয়ন টন আমদানি করতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এমওপির আমদানি ব্যাহত, ফলে দাম বেড়েছে। শেরপুরের কৃষক সাবুজ মিয়া বলেন, “আমরা নির্ধারিত ১,০৫০ টাকায় এক বস্তা সারের পরিবর্তে ১,৬৫০ টাকা খরচ করছি। নভেম্বর-ডিসেম্বরের চূড়ান্ত মৌসুমে এটা ফসলের জন্য বিপজ্জনক।”
কৃষি মৌসুম এর মধ্যেই অনেক দেরীতে ২৪ নভেম্বর সরকার ৭৫,০০০ মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে—৪০,০০০ টন ইউরিয়া সৌদি আরব থেকে এবং ৩৫,০০০ টন এমওপি রাশিয়া থেকে, মোট ৩৯৯.৫০ কোটি টাকায়। ৯ নভেম্বর আরও ১.৭০ লক্ষ মেট্রিক টন ইউরিয়া ও টিএসপি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১২ নভেম্বর ৮০,০০০ মেট্রিক টন সারের প্রস্তাব অনুমোদিত।
কিন্তু বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওয়ালিউর রহমান বলছেন, সরকারের বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হলে আমদানি ব্যাহত হবে। আর কৃষি মৌসুমের আগে সার আমদানি না করায়, ফসলের প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের দাম ৮৩% বাড়িয়ে (১৬ টাকা থেকে ২৯.২৫ টাকা প্রতি ঘনমিটার) উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা কৃষকের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ইউএসডিএ-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমওপির ২০% সংকট হলে ধানের ফলন ১৫-২০% কমবে, যা খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে।
কৃষক সংগঠনগুলো দাবি করছেন, সারের ন্যায্য বিতরণ, চড়া দামের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আমদানির গতি বাড়ানো। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে শীতকালীন বোরো মৌসুমে খাদ্য সংকট আরও গভীর হতে পারে।
