আন্তর্জাতিক বার অ্যাসোসিয়েশনের মানবাধিকার ইনস্টিটিউট (আইবিএএইচআরআই) বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেছে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে।
এই উদ্বেগের কারণ, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতে ২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি।
আইবিএএইচআরআইর পরিচালক ব্যারোনেস হেলেনা কেনেডি বলেন, বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থাকে অন্যায্য এবং একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় প্রতিহিংসা চরিতার্থের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, প্রতিটি বিচারই ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি একটি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের ক্ষেত্র। বিশেষ করে যেখানে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ থাকে, সেখানে ন্যায়বিচার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো সব সময় প্রযোজ্য থাকে, এমনকি জরুরি অবস্থা, সশস্ত্র সংঘাত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ও। অতীতের নৃশংস ঘটনার বিচার জরুরি হলেও, তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও যোগ্য আদালতের মাধ্যমে হতে হবে।
তিনি নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের সরকারকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করার এবং সংবিধান ও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) অনুযায়ী ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
গত ১৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছর ছাত্রদের বিক্ষোভে সহিংতার দায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ওপর চাপিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। যা নিয়ে ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। একপেশে ও প্রহসনমূলক বিচারব্যবস্থাকে ক্যাঙ্গারু কোর্ট আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আইবিএএইচআরআই বলেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার জরুরি। তবে সব বিচারকাজ অবশ্যই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড মেনে হতে হবে। সংস্থাটি সব পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা করেছে।
টিউলিপ সিদ্দিক এবং তার কয়েকজন আত্মীয়ের বিরুদ্ধে জমি অবৈধভাবে বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। তিনি বারবার বলেছেন, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো অভিযোগ জানানো হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার পছন্দের আইনজীবীও হয়রানি, হুমকি এবং গৃহবন্দি অবস্থায় চলাফেরায় বাধার অভিযোগ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বাংলাদেশ হাইকমিশনে আবিদা ইসলামকে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে তারা বিচার কার্যক্রম পরিচালনার ধরন নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানান। তাঁদের মতে, এসব বিচার ছিল কৃত্রিমভাবে সাজানো এবং এগুলো ছিল অন্যায্যভাবে মামলা পরিচালনার একটি উপায়।
শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়—যা তাঁদের অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে—তাতেও ন্যায়বিচার নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা জাতিসংঘের বিশেষ প্রক্রিয়ায় জরুরি আবেদন করেছে। আবেদনে বলা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়ায় অনেক ত্রুটি রয়েছে। এর মধ্যে আছে অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হওয়া, নিজের পছন্দের আইনজীবী নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া এবং এমন একজন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীর ওপর নির্ভর করানো, যার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি এবং যাকে তিনি কোনো নির্দেশনাও দেননি।
ওই আবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায়বিচার মানদণ্ড পূরণ না করা কোনো বিচারের পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া মানে কার্যত তাৎক্ষণিক বিচারবহির্ভূত হত্যার শামিল, এবং এটি আইসিসিপিআরের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা জীবনের অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
২০২৪ সালে ছাত্রদের আন্দোলন-সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিধি মোতাবেক গৃহীত পদক্ষেপে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে এতে ১,৪০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়। আরও প্রাণঘাতী হামলা এড়াতে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।
ড. ইউনূস ক্ষমতা নিয়ে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি নতুন অঙ্গীকারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে সাম্প্রতিক বিচারগুলো স্বীকৃত আইনি মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এতে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রকৃত ন্যায়বিচার মানদণ্ড অনুসরণ না করলে কোনো অর্থবহ জবাবদিহি সম্ভব নয়। আইবিএএইচআরআই বাংলাদেশকে আইসিসিপিআরের অধীনে তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দক্ষ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ক মৌলিক নীতিমালায় ন্যায্য ও প্রকাশ্য শুনানির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে আইনজীবীদের ভূমিকা বিষয়ক জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পছন্দমতো আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে এবং রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আইনজীবীরা ভয়ভীতি, বাধা বা হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আইবিএএইচআরআইর সহ-সভাপতি মার্ক স্টিফেন্স বলেন, টিউলিপ সিদ্দিকের মামলার মতো ঘটনা যেখানে প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, তা ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তিকে আঘাত করে এবং বাংলাদেশে আইনের শাসনকে দুর্বল করে।
তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার। অন্তর্বর্তী সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আইনজীবীরা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন এবং বিচার যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়।
এ ছাড়া আইবিএএইচআরআই বাংলাদেশ সরকারের কাছে সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করার, মৃত্যুদণ্ডে আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ দেওয়ার এবং স্থায়ীভাবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে।
আইবিএএইচআরআই সব পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।
