রাজধানীর অদূরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার একতলা ভবনে গতকাল শুক্রবার দুপুরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মাদ্রাসা পরিচালক শেখ আল আমিন (৩২), তার স্ত্রী আছিয়া বেগম (২৮) এবং তাদের দুই ছেলে উমায়েত (১০) ও আবদুল্লাহ (৭) আহত হয়েছেন। পার্শ্ববর্তী ভবনের আরও কয়েকজনের আহত হওয়ার খবর মিলেছে।
বিস্ফোরণের তীব্রতায় মাদ্রাসা ভবনের কয়েকটি কক্ষের দেয়াল ধসে পড়ে এবং ছাদে ফাটল ধরে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। প্রাথমিক তদন্তে গ্যাস লিকের সন্দেহ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কারণ গ্যাস সিলিন্ডার অক্ষত পাওয়া গেছে।
এই ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাদ্রাসাগুলোর বিস্তার ঘটলেও সেগুলো নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিভিন্ন আন্দোলনে মাদ্রাসা ছাত্ররা রাস্তায় নামলেও সশস্ত্র কার্যকলাপের প্রমাণ মেলেনি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ছাড়াও হেফাজতে ইসলামের “ভাস্কর্যবিরোধী” বিক্ষোভে হাজারে হাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া আর সতর্ক অবস্থানের কারণে কোন অবস্থানই দীর্ঘায়িত হয়নি।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে পরিস্থিতি বদলে গেছে। মাদ্রাসাগুলোতে বিস্ফোরক সংরক্ষণ বা তৈরির মতো ঘটনা উদ্বেগের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। প্রথম আলো অফিসে হামলা ও অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু করে গত ১৭ মাসে সবরকম সহিংসতা আর বিক্ষোভে মাদ্রাসা ছাত্রদের উপস্থিতি প্রচন্ডভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
ড. ইউনূসের ক্ষমতা দখলের পর মাদ্রাসার ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতায়িত হয়েছে। বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরে যার যার শিক্ষাক্ষেত্র বা কর্মকাণ্ডে ফিরে গেলেও, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসা থেকে আগত শিক্ষার্থীরা এখনও সহিংসতা ও মব সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের জুজু দেখিয়ে তাদের অবস্থান সুসংহত করছে।
প্রথম আলো অফিস, ছায়ানট থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় হাইকমিশন হামলায় “নারায়ে তাকবির” স্লোগানে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে মাদ্রাসা থেকে আগত শিক্ষার্থীরাই। অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে সহায়ক মিডিয়া প্রথম আলো হামলার পরে, এই হামলার সাথে জড়িত যাদের পুলিশ একান্ত বাধ্য হয়ে গ্রেপ্তার করছে, তাদের সকলের সাথে মাদ্রাসার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
এখন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে মাদ্রসারই ছাত্ররা আরেকটা বিক্ষোব চালিয়ে যাচ্ছে শাহবাগে। বিগত ১৭ মাসে সবসময় কোন না কোন ইস্যুতে মাদ্রাসার ছাত্ররা রাজপথে ছিল, ইমানি জজবার সাথে কোন না কোন আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছে, আর যখনই তারা সংখ্যা বড় হয়েছে, তখনই কোন না কোন সহিংস হামলা হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমন করার জন্য শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গঠিত বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যেমন বাংলাদেশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC), যারা জঙ্গি কার্যক্রম প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও নিষ্ক্রিয় করার কাজ করতো। এই স্কোয়াডগুলো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় অত্যাধুনিক কৌশল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে।
প্রধান কাজ ও দায়িত্ব:
সন্ত্রাস প্রতিরোধ: জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ, তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করা এবং পরিকল্পিত হামলা প্রতিরোধে কাজ করা.
গোয়েন্দা কার্যক্রম: সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও শেয়ার করা.
সরাসরি অভিযান: সন্দেহভাজন জঙ্গি বা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা এবং সরাসরি সংঘাতে তাদের মোকাবিলা করা.
বিশেষায়িত ইউনিট: বোমা নিষ্ক্রিয়করণ (Bomb Squad) এবং সাইবার ক্রাইম তদন্তের মতো বিশেষায়িত বিভাগ থাকে
বর্তমানে এই ইউনিটগুলো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। ৫ই আগস্টের পরবর্তিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে আটক করে রাখা শীর্ষ জঙ্গিদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাদের নেটওয়ার্ক আবার পুরোপুরি সক্রিয় এবং একইসাথে বাংলাদেশে সন্দেহজনকভাবে পাকিস্থানি নাগরিকদের যাতায়াত বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এ সকল তথ্য যাচাই আর যেকোন হামলার সম্ভাবনা নস্যাৎ করার জন্য বিশেষায়িত কোন বাহিনী এই মুহুর্তে বাংলাদেশে নেই।
আফগানিস্তানে মোল্লা ওমরের তালেবানরা মাদ্রাসাকে ঘাঁটি বানিয়েই প্রশিক্ষিত হয়েছিল, ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এবং একদিন মাদ্রাসা থেকে সশস্ত্র অবস্থায় বের হয়ে এসেই দেশ দখল করেছিলো। পাকিস্তানে অনেক মাদ্রাসা জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এ বছর মে মাসে ভারত পাকিস্থানের জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে সার্জিকাল এয়ার স্ট্রাইক চালায়। জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিটা লক্ষ্যবস্তু মসজিদের আশেপাশে মাদ্রাসা ছিল বলে জানা যায়।
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে?
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণতর হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানি কার্গো শতভাগ ইন্সপেকশনের বাধ্যবাধকতা মুক্ত থাকার সুবাদে বিষ্ফোরক ও অস্ত্রের কিছু চালান মাদ্রাসাগুলোতে পৌঁছেছে। কোনো কোনো মাদ্রাসা আফগান-পাকিস্তানি মডেলে সশস্ত্র প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি ভারতের নিরাপত্তা সম্মেলনে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকায় জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য দেওয়া হয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এসব কেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই প্রতিশ্রুতি পালনের ইচ্ছা ও সক্ষমতা আদৌ আছে কি?
কেরানীগঞ্জের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল গিয়ে দেখিয়ে গেছে, আশঙ্কাগুলো অমূলক নয়। মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার্থীদের উত্থান কারোরই চোখ এড়াচ্ছে না।
দেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। সরকারের কাছে প্রশ্ন: মাদ্রাসা আর জঙ্গিবাদের সংস্কারের কী করলেন? প্রথম আলোর অফিসে হামলাকে প্রধান উপদেষ্টার পেজ থেকে “বিচ্ছিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর হামলা” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেই বিচ্ছিন্ন উগ্রবাদীদের নিবৃত্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
