আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পুত্র ও তাঁর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সদ্য প্রকাশিত একটি গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে অংশ নিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ছাত্রদের আন্দোলন-বিক্ষোভ, কোটা ব্যবস্থা, তাঁর সরকারের ব্যর্থতা, উগ্রবাদীদের উত্থান এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ছাত্র আন্দোলন এবং কোটা ব্যবস্থা সম্পর্কে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, কোটা বিলুপ্তির দাবিতে সৃষ্ট ছাত্রদের আন্দোলন অযৌক্তিক ছিল না। এটি যৌক্তিক দাবি ছিল। পুরনো কোটা ব্যবস্থা সত্যিই খুব প্রাচীন এবং অর্থহীন ছিল। তবে, অধিকাংশ লোকই জানে না, আমাদের সরকার কয়েক বছর আগে সেই কোটাগুলো অপসারণ করেছিল।
মূলত আদালত এটা পুনর্বহাল করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের একটি মামলার ভিত্তিতে। আমাদের সরকার যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, তা হলো যোগাযোগ এবং বার্তা প্রচারে। আমরা এ বিষয়ে কিছু বলিনি। আমরা এটি আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং এটি আন্দোলনকে বাড়তে দিয়েছে। এটি আমাদের প্রথম ব্যর্থতা ছিল।
তারপর বিরোধীদল, উগ্র ইসলামপন্থীরা এবং এমনকি বিভিন্ন অপশক্তি এতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনকে সহিংস করে তোলে। সশস্ত্র জঙ্গিরা থানায় আক্রমণ করে। যদি আপনি আমার মায়ের অডিও রেকর্ডিংগুলো শোনেন যা আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে- তাহলে আপনি সশস্ত্র জঙ্গিদের থানায় হামলার বিষয়টি আলোচনায় শুনতে পাবেন। সেই সময়ে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। নিরীহ প্রতিবাদকারী, নিরীহ সাধারণ নাগরিকরা আহত হয়েছে। সকল মৃত্যুই দুঃখজনক। আমাদের সরকার কোনো মৃত্যু চায়নি, কিন্তু এটি ঘটেছে। সহিংসতা জঙ্গিদের দ্বারাই শুরু হয়েছে, সরকারের দ্বারা নয়।
বর্তমান অ-নির্বাচিত শাসন এবং জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের মুক্তি
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, আপনারা দেখেছেন গত দেড় বছরে, একটি অ-নির্বাচিত শাসনব্যবস্থা কোনো ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতায় আঁকড়ে ধরে আছে। শুধু তাই নয়, এই শাসনের প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল সকল দোষী সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া। এই মুক্তি পাওয়া জঙ্গিদের অনেকেই ২০১৬ সালের হলি আর্টিজানে নাশকতা, ব্লগার হত্যা, স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসের কর্মীর হত্যার মতো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার তাদের খুঁজে বের করে, গ্রেপ্তার করে, বিচার করে, কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকার তাদের মুক্তি দিয়েছে। কেন তারা এটি করেছে? কারণ এই শাসন ইসলামপন্থী, চরমপন্থীদের দ্বারা সমর্থিত।
উগ্র ইসলামপন্থীদের প্রভাব এবং সহিংসতার দায়ভার
বিক্ষোভকারীরা নিজেরা ইসলামপন্থী এবং জঙ্গি ছিল না, কিন্তু ইসলামপন্থী এবং জঙ্গিরা প্রতিবাদ সমাবেশে অনুপ্রবেশ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তারা বাংলাদেশের টেলিভিশনে নাশকতা চালায় এবং ফেসবুকে স্বীকার করে নিয়েছে যে যদি আমরা সহিংসতা না করতাম, যদি আমরা পুলিশ হত্যা না করতাম, যদি আমরা বিভিন্ন স্থাপনা না পোড়াতাম, তাহলে বিপ্লব সফল হতো না। তারা এটি খোলাখুলিই বলেছে। তাই ইউনূস সরকার ইসলামপন্থীদের প্রতি ঋণী।
বাংলাদেশের বর্তমান ইউনূস শাসন মূলত একটি উগ্র ইসলামপন্থী শাসন। তারা সহিংসতার দায়ভার মব সন্ত্রাসের উপর চাপিয়ে দেয়। ইউনূসের নিজস্ব মুখপাত্র তাদের প্রেশার গ্রুপ বলে উল্লেখ করে। ২০২৪ সালের আগস্টেই কয়েকটি প্রগতিশীল টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয় এবং সংবাদ সংস্থা পোড়ানো হয়েছে। আরও সম্প্রতি, দুটি বৃহত্তম দৈনিক, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার, তাদের অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং দায়মুক্তি
ইউনূস সরকার ও তার অনুগতদের উদ্দেশ্যে সজীব ওয়াজেদ বলেন, তারা আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে বলে- কারণ আওয়ামী লীগ নাকি ছাত্রদের হত্যা করেছে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, অনেক ছাত্র, নিরীহ লোক প্রতিবাদে মারা গেছে, কিন্তু অনেক পুলিশ কর্মকর্তা, আমাদের দলীয় নেতাকর্মীরাও মারা গেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১৪০০ জনের মৃত্যুর তালিকা রয়েছে, কিন্তু জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আগস্ট ৫ থেকে আগস্ট ১৫ পর্যন্ত, আমাদের সরকার ক্ষমতায় না থাকা সেই ১০ দিনে শত শত নিহতের নাম তালিকায় রেখে আমাদের ওপর দায় চাপিয়েছে। আমাদের সরকার একটি বিচারিক কমিটি গঠন করেছিল সকল হত্যার তদন্ত করার জন্য। আমাদের সরকার কাউকে দায়মুক্তি দেয়নি। অথচ ইউনূস সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে সকল পুলিশ কর্মকর্তার হত্যা, সকল আওয়ামী লীগ কর্মীর হত্যাসহ সকল নাশকতার জন্য দায়ীদের দায়মুক্তি দিয়েছে।
পক্ষপাতমূলক সংসদ নির্বাচন এবং দমন-পীড়ন
জয় বলেন, আওয়ামী লীগের উপর একটা ডি ফ্যাক্টো নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মূলত সকল প্রগতিশীল দলের উপরেই অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এটি বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন। জাতীয় পার্টি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল। তাদের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেক নেতা এখন জেলে। অনেক নেতার বাড়ি পোড়ানো হয়েছে। তাদের কোনো নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করতে, জনসমক্ষে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্যান্য ছোট দল, সকল প্রগতিশীল দল দমন করা হচ্ছে। এটি একেবারেই পক্ষপাতমূলক নির্বাচন। এটি আসলে কোনো নির্বাচনই নয়।
বিএনপি এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ
সজীব ওয়াজেদ বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম দল। আগে-পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসতই। কিন্তু কেন মার্কিন দূতাবাস এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিএনপি এবং তারেক রহমানকে হাইলাইট করছে? তারেক রহমানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এফবিআই এজেন্টদের প্রদত্ত প্রমাণের ভিত্তিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অন্যান্য অভিযোগ আনার প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। তারা এটি করতে চায়নি কারণ তারা এটি তাদের হাতে রেখেছে। বিএনপি এই রেফারেন্ডামকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছে কিন্তু সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে দুর্বল করে। তারেক রহমান এই মুহূর্তে মার্কিন দূতাবাসের নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে।
জামায়াতের উত্থান এবং পোস্টাল ভোটের অপব্যবহার
জামায়াতের কখনো বড় ভোট ব্যাঙ্ক ছিল না। জামায়াত সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০% ভোট পায়। জামায়াত সমর্থিত ইউনূস শাসনে তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা। জরিপ বলছে বিএনপি ২০% এ আটকে আছে। জামায়াত ১৫ থেকে ২০% এ আটকে আছে। ইউনূস শাসন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোট অনুমোদন করেছে। পোস্টাল ভোট যাচাই করা খুব কঠিন। ইতিমধ্যে অনেক ভিডিও অনলাইনে ফাঁস হয়েছে, হাজার হাজার পোস্টাল ভোটের- যা জামায়াত কারচুপি করেছে।
জামায়াতের লক্ষ্য, শরিয়া আইন চালু করে বাংলাদেশে ইসলামি খেলাফত কায়েম করা। ইউনূস শাসন সব জঙ্গি-সন্ত্রাসীর মুক্তি দিয়েছে। আল-কায়েদা সদস্যরা দূরভিসন্ধি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের জন্য এটি খুব উদ্বেগজনক যে, জামায়াত বহিঃশক্তির প্রভাব বিস্তার করবে। পাকিস্তানের সাথে মিলে ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটানোর শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সজীব ওয়াজেদ জয়ের অনুরোধ
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই এই নির্বাচনকে প্রভাবিত, পক্ষপাতমূলক এবং কারচুপিপূর্ণ বলে ঘোষণা করতে হবে। এটি লোক দেখানো নির্বাচন। আওয়ামী লীগের ৪০% ভোট ব্যাঙ্ক রয়েছে। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামী দল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সংখ্যালঘুরা শুধুমাত্র নিরাপদ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাই, ১১ দিনের কম সময় বাকি, যদি আপনারা এখনই এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে কথা না বলেন, তবে এটি হবে জামায়াতকে ঠেকাতে আপনাদের জন্য শেষ সুযোগ। আমি আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই।
