ইব্রাহিম চৌধুরী
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করার লক্ষ্যে উত্থাপিত দ্বিদলীয় যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে ভোটাভুটিতে নাকচ হয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত ভোটে প্রস্তাবটি সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটি থেকে সরিয়ে আলোচনায় আনার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ভোটের ফল দাঁড়ায় ৪৭ বনাম ৫৩। রিপাবলিকানদের অধিকাংশই দলীয় অবস্থান অনুসরণ করে প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন, যদিও দলের ভেতরে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ও কৌশল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রিপাবলিকানদের মধ্যে কেবল কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের সিনেটর র্যান্ড পল প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছেন। অপরদিকে রিপাবলিকান দলের মধ্যপন্থী দুই সিনেটর—মেইনের সুসান কলিন্স এবং আলাস্কার লিসা মুরকাউস্কি—যুদ্ধ নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন।
ভোটের আগে সুসান কলিন্স বলেন, প্রশাসন এবার কংগ্রেসকে আগের তুলনায় বেশি ব্যাখ্যা দিয়েছে। পরে এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব পাস হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের জন্য ভুল বার্তা দেবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে অবশ্যই নিয়মিতভাবে কংগ্রেসকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত রাখতে হবে।
লিসা মুরকাউস্কিও বলেন, প্রশাসন আগের কিছু সামরিক অভিযানের তুলনায় এবার যোগাযোগ কিছুটা ভালো করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সংঘাতের শেষ কোথায়—এ বিষয়ে এখনও পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা নেই। তার মতে, এই প্রশ্নটিই এখন অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানে সামরিক হামলার প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন তুলনামূলকভাবে কম। রয়টার্স ও ইপসোস পরিচালিত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় বারোশোর বেশি প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ এই হামলাকে সমর্থন করেছেন, আর ৪৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন।
ডেমোক্র্যাটিক দলের মধ্যে পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যান ছিলেন একমাত্র সদস্য যিনি প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার ভোটের আগে বলেন, এই সিদ্ধান্ত মূলত এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত—সিনেট কি আবারও আমেরিকার তরুণদের একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে প্রস্তুত?
রিপাবলিকান নেতারা অবশ্য ভিন্ন অবস্থান নেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং তিনি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন বলেন, প্রেসিডেন্ট দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও নাগরিকদের সুরক্ষাই তার প্রধান লক্ষ্য।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ ক্যারোলিনার সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগকে “অসাংবিধানিক” বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, এটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা।
তবে সব রিপাবলিকানই যে নিশ্চিন্ত, তা নয়। ইন্ডিয়ানার সিনেটর টড ইয়াং বলেন, প্রশাসন যুদ্ধের সময়সীমা ও লক্ষ্য নিয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। তার মতে, কংগ্রেসের উচিত ছিল যুদ্ধ শুরুর আগেই বেশি প্রশ্ন তোলা এবং শুনানি আয়োজন করা। তিনি বলেন, “এখন বাস্তবতা হলো—আমরা যুদ্ধে আছি।” ইয়াং আরও সতর্ক করেন, এই মুহূর্তে হঠাৎ করে সামরিক অভিযান বন্ধ করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ইরান ও পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
আরেক রিপাবলিকান সিনেটর জেরি মোরান জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন কংগ্রেস সদস্যদের ব্রিফিং দিলেও সংঘাত কতদিন চলবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, এই প্রশ্নের উত্তর “সম্ভবত এখনই জানা সম্ভব নয়।”
এদিকে র্যান্ড পল ভোটের আগে সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় বিদেশে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা সেই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—যেমন আফগানিস্তানের যুদ্ধ দুই দশক ধরে চলেছিল। তার মতে, এই যুদ্ধ কতদিন চলবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।
