তৌহিদুল ইকবাল সম্পাদ
মা-বাবার স্নেহের বণ্টন কি সবসময় সমান হয়? অদ্ভুত হলেও সত্য, অনেক পরিবারেই দেখা যায় যে সন্তানটি সবচেয়ে বেশি অবাধ্য, অকৃতজ্ঞ বা তথাকথিত ‘কুলাঙ্গার’, মা-বাবার সমস্ত মনোযোগ এবং দুর্বলতা যেন তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। অন্যদিকে, যে সন্তানটি লক্ষ্মী, স্বাবলম্বী এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, সে দিনশেষে মা-বাবার অবহেলার শিকার হয়।
এই আপাতদৃষ্টিতে অন্যায্য আচরণের পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং বিবর্তনীয় কারণ।
কেন অবাধ্য সন্তানই বেশি আদর পায়?
১. শৈশবের ‘টাইম অ্যান্ড এনার্জি’ ইনভেস্টমেন্ট:
যে সন্তানটি ছোটবেলা থেকেই সমস্যা সৃষ্টিকারী, মা-বাবাকে তার পেছনে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। তাকে চোখে চোখে রাখা, তার জন্য রাত জাগা, তার স্কুলের অভিযোগ সামলানো—এই প্রক্রিয়ায় মা-বাবার বিপুল পরিমাণ মানসিক ও শারীরিক শক্তি সেই নির্দিষ্ট সন্তানের ওপর ব্যয় হয়ে যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘Sunk Cost Fallacy’। অর্থাৎ, একটি জায়গায় যখন মানুষ অনেক বেশি বিনিয়োগ করে ফেলে, তখন সেই বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে সে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে থাকে। মা-বাবা অবচেতনভাবেই ভাবেন, “এত কষ্ট করলাম এর পেছনে, এখন হাল ছাড়লে তো সব বৃথা।”
২. স্বাবলম্বীর প্রতি নিশ্চিন্ত অবহেলা:
ভালো সন্তানটি নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে। সে মা-বাবাকে কোনো ঝক্কি দেয় না। ফলে মা-বাবা ধরে নেন যে তাকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। এই “নিশ্চিন্ত থাকা” থেকেই শুরু হয় অবহেলা। অথচ যে সন্তানটি অপদার্থ, তাকে নিয়ে মা-বাবা সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন। এই দুশ্চিন্তাই তাদের মধ্যে এক ধরণের ‘প্রটেক্টিভ ইনস্টিন্ট’ বা অতি-সুরক্ষার জন্ম দেয়।
৩. সম্পত্তির অসম বণ্টন:
মৃত্যুর আগে অনেক মা-বাবাই তাদের সহায়-সম্পত্তি সেই অযোগ্য সন্তানকে দিয়ে যেতে চান। তাদের যুক্তি থাকে— “ভালো ছেলেটা তো কামিয়ে খেতে পারবে, কিন্তু এই গাধাটা তো না খেয়ে মরবে।” এখানে তারা ন্যায়ের চেয়ে করুণাকে বেশি প্রাধান্য দেন, যা পরোক্ষভাবে যোগ্য সন্তানের প্রতি চরম অবিচার।
কী বলছে আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও গবেষণা?
এই বিষয়টি স্রেফ আবেগ নয়, বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত একটি রূঢ় বাস্তবতা।
প্যারেন্টাল ডিফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট (PDT): কর্নেল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী কার্ল পিলমার (Karl Pillemer) একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় (Within-Family Differences Study) দেখিয়েছেন যে, প্রায় ৭০% মা-বাবা কোনো একজন নির্দিষ্ট সন্তানের প্রতি বেশি দুর্বলতা অনুভব করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ‘ফেভারিট’ সন্তান সবসময় সবচেয়ে সফল সন্তান হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই হয় যে মা-বাবার সবচেয়ে বেশি ‘ইমোশনাল সাপোর্ট’ বা ‘টেনশন’ দাবি করে।
অ্যাংজাইটি এবং অ্যাটাচমেন্ট: গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব সন্তান মা-বাবাকে বেশি মানসিক চাপে রাখে, তাদের প্রতি মা-বাবার এক ধরণের ‘অ্যাম্বিভ্যালেন্ট অ্যাটাচমেন্ট’ (Ambivalent Attachment) তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তা মা-বাবাকে সেই সন্তানের প্রতি আরও বেশি আঠার মতো লেগে থাকতে বাধ্য করে।
সার্ভে ডাটা: একটি ব্রিটিশ সার্ভে অনুযায়ী, মা-বাবারা স্বীকার করেছেন যে তারা সেই সন্তানকে বেশি সাহায্য করেন যে আর্থিকভাবে বা মানসিকভাবে পিছিয়ে আছে, এমনকি যদি সেই পিছিয়ে থাকার কারণ তার নিজের চারিত্রিক দোষও হয়। তারা একে ‘উইক লিংক থিওরি’ হিসেবে দেখেন— অর্থাৎ পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল শিকলটিকেই তারা সবচেয়ে বেশি টেনে ধরে রাখতে চান।
উপসংহার:
ভালো হওয়া বা স্বাবলম্বী হওয়া অনেক সময় এক ধরণের একাকীত্বের অভিশাপ নিয়ে আসে। মা-বাবার এই ইনভেস্টমেন্ট পলিসি হয়তো টিকে থাকার আদিম প্রবৃত্তি, কিন্তু এটি যোগ্য সন্তানের মনে যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের সৃষ্টি করে, তার ক্ষতিপূরণ কোনো সম্পত্তি দিয়েই সম্ভব নয়।
আপনার চারপাশে কি এমন উদাহরণ দেখেছেন? যেখানে যোগ্য সন্তান অবহেলিত আর অযোগ্য জন সব কেড়ে নিচ্ছে?
