#
নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। গুরুতর আহত কনস্টেবল চিকিৎসাধীন।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় গভীর রাতে একদল উশৃঙ্খল দুষ্কৃতিকারীর অতর্কিত হামলায় পুলিশের এক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এবং এক কনস্টেবল গুরুতর জখম হয়েছেন। হামলার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, দুর্বৃত্তরা পুলিশের ব্যবহৃত একটি শটগান ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় স্থানীয় হাবিব নগর এলাকা। পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে ছিনতাই হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত: একটি অভিযোগ ও তদন্তের কল
ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন এএসআই সোহেল রানা।
সেই রাতে সিফাত ওরফে টুটুল, শাহরিয়ার তানভীর এবং আবু সুফিয়ান ওরফে চমক নামে তিন যুবক তাদের মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনতাইয়ের শিকার
হয়েছেন বলে বন্দর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন।
থানার ডিউটি অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি তদন্তের জন্য দায়িত্বরত এএসআই সোহেল রানাকে নির্দেশ দেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রাথমিক তদন্তের উদ্দেশ্যে এএসআই সোহেল রানা কনস্টেবল ফয়সাল হোসেনসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে করে বন্দর থানাধীন
পুরান বন্দর চৌধুরী বাড়ির হাবিব নগর রোডে জনৈক গুলু মিয়ার বাড়িতে অভিযানে যান।
হামলার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত
পুলিশ যখন গুলু মিয়ার বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে, তখনই সেখানে ওত পেতে থাকা ১৪-১৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল অতর্কিত হামলা চালায়।
রামদা, চাপাতিসহ দেশীয় বিভিন্ন মারণাস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্বৃত্তরা।
সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের কোপে কনস্টেবল ফয়সাল হোসেনের ডান হাতের দুটি আঙুল বিচ্ছিন্নপ্রায় হয়ে যায় এবং পেটের নিচের অংশে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়।
ফয়সাল মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তার হাতে থাকা সরকারি শটগানটি ছিনিয়ে নেয়।
বাধা দিতে গেলে এএসআই সোহেল রানাও রক্ষা পাননি; তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে কুপিয়ে জখম করা হয়।
জনমানবহীন রাতে পুলিশের আর্তচিৎকারে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান পরিস্থিতি
হামলার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বন্দর থানা ও পার্শ্ববর্তী ফাঁড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যবৃন্দ।
রক্তাক্ত অবস্থায় দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে দ্রুত বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে কনস্টেবল ফয়সাল হোসেনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
সাঁড়াশি অভিযান ও অস্ত্র উদ্ধার
ঘটনার পর পর অপরাধীদের ধরতে পুরো এলাকা ঘেরাও করে ফেলে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) তারেক আল মেহেদীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে শুক্রবার ভোররাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
অবশেষে শুক্রবার ভোরে চৌধুরী বাড়ির জনৈক সোহানের টিনশেড ঘরের পেছন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিনতাই হওয়া শটগানটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) তারেক আল মেহেদী গণমাধ্যমকে বলেন,
“পুলিশের ওপর হামলা এবং সরকারি অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করেছি এবং তিনজনকে হেফাজতে নিয়েছি।এই চক্রের বাকি সদস্যদের এবং ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীদের ধরতে আমাদের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি
হাবিব নগর এবং পুরান বন্দর এলাকায় বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্তরা ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল, তবে পুলিশের ওপর এমন দুঃসাহসিক হামলার ঘটনায় তারা স্তম্ভিত।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর এই ধরনের হামলা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি।
জননিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের এভাবে রক্তাক্ত হওয়া অপরাধীদের ঔদ্ধত্যেরই প্রমাণ দেয়।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
