সংবিধানে বড় সংস্কারের ঘোষণা দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া ও জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা অন্তর্ভুক্তিসহ আসছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি সংবিধানের বর্তমান বিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সংশোধনীর প্রস্তাব করেন। তার এই বক্তব্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো—সংবিধানের তফসিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়ার ঘোষণা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সংবিধান কোনো অনড় বিষয় নয় যে একে পরিবর্তন করা যাবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সংবিধান কখনো স্থবির থাকে না; এটি প্রয়োজন অনুযায়ী রহিত, স্থগিত বা সংশোধন করা সম্ভব।”
৭ মার্চের ভাষণ ও ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকারের সময় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ‘লেজিসলেটিভ ফ্রড’ বা আইনি প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বিশেষ করে সংবিধানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিলের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন,
“৭ মার্চের ভাষণসহ এমন কিছু বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা প্রকৃত ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই সার্বভৌম সংসদের মাধ্যমে এই অংশগুলো বিলুপ্ত করা সময়ের দাবি।”
স্বাধীনতার ঘোষণা ও শহীদ জিয়ার ভূমিকা
ইতিহাসের বিকৃতি রোধে সরকারের অনড় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষণা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে,
বর্তমান সরকার তার অবসান ঘটাতে চায়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন:
“শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর ২৭ মার্চ তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ‘প্রোভিশনাল হেড অব স্টেট’ হিসেবে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এটিই এদেশের মাটির প্রকৃত ইতিহাস। আমরা সংবিধানে এই সত্যটিকেই পুনরায় স্থাপন করতে চাই।”
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেবল ইতিহাস সংশোধন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রশাসনিক সংস্কার নিয়েও নতুন পরিকল্পনার কথা জানান।
তিনি জানান, দেশের শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে সরকার উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তনের কথা ভাবছে।
প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
সদস্য সংখ্যা: ১০০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে এই উচ্চকক্ষ।
প্রতিনিধিত্ব: রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে এখানে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে।
উদ্দেশ্য: এককেন্দ্রিক ক্ষমতার চর্চা রোধ করা এবং আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জনগণই রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস। আর সেই ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটে জাতীয় সংসদে। আমরা সংসদকে প্রকৃত অর্থেই কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে চাই।”
পঞ্চদশ সংশোধনী ও আইনি জটিলতা
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মন্ত্রী সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আইনি বৈধতা নিয়ে কথা বলেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, উচ্চ আদালত ইতোমধ্যে এই সংশোধনীর বেশ কিছু অংশকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন।
তাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো, আদালতের নির্দেশনার আলোকে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধানের বাকি অংশগুলো বাতিল বা প্রয়োজনীয় সংশোধন করা।
তার মতে, বিগত ১৫ বছরে সংবিধানকে যেভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য এই বড় ধরণের অস্ত্রোপচার অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
নাগরিক ও রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার পূর্বাভাস
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়ার বিষয়টি যেমন একটি পক্ষকে ক্ষুব্ধ করতে পারে, তেমনি শহীদ জিয়ার ঘোষণার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি অন্য পক্ষকে সন্তুষ্ট করবে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা কেবল সত্য প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানকে আধুনিকায়ন করার লক্ষে কাজ করছে।
