ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
সিআইএ প্রধানের গোপন সফর করেছেন, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে আনুষ্ঠানিক ভাবে। — কিউবায় যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
মার্কিন তেল অবরোধে বিধ্বস্ত কিউবা এখন সামরিক আক্রমণের আশঙ্কায় কাঁপছে। বিদ্যুৎ নেই, ওষুধ নেই, জ্বালানি নেই — তবু হাভানা বলছে, “আমরা প্রস্তুত।”
গত কয়েকদিন ধরে সিএনএন-এর হাভানা অফিসের ভবন ম্যানেজার বারবার দরজায় কড়া নাড়ছেন একটিই জরুরি প্রশ্ন নিয়ে। মার্কিন আক্রমণের সময় কর্মীরা অফিসে আসবেন কিনা। “উপর থেকে নির্দেশ এসেছে,” তিনি জানান — রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিটি ভবনকে ‘সাম্রাজ্যবাদী হামলার’ প্রেক্ষিতে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
চলমান মার্কিন তেল অবরোধের কারণে অফিসে দিনে বহুবার বিদ্যুৎ চলে যায়। জেনারেটর চালানোর জ্বালানি নেই, টয়লেটে টিস্যু পেপার নেই।
এই সপ্তাহে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ “United States of America” লেখা সরকারি বিমানে চড়ে হাভানায় পৌঁছান। এটি কিউবানদের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক ধাক্কা। কিউবার সরকারের কাছে সিআইএ কার্যত শয়তানের প্রতীক। একটি সংস্থা যে ১৯৬০-এর দশকে ফিদেল কাস্ত্রোকে বিস্ফোরক সিগার ও বিষাক্ত ডাইভিং স্যুট দিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। সেই সংস্থার প্রধান এখন তাদের রাজধানীতে!
বৈঠকের ছবিতে দেখা যায়, কালো পর্দা টানা একটি কক্ষে ফুলে সাজানো লম্বা টেবিলে দুই পক্ষ মুখোমুখি। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মুখ ঝাপসা করা হয়েছে — শুধু র্যাটক্লিফের চেহারা স্পষ্ট। কূটনৈতিক বিশ্লেষক পিটার কর্নব্লু এই সফরকে বলছেন “সারেন্ডার, নইলে খেসারত দাও” — এক ধরনের ‘সাবমিশন ডিপ্লোম্যাসি’।
কিউবান কর্মকর্তারা বৈঠকে যুক্তি দেন যে তাদের দেশ মার্কিন নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নয়। কিন্তু র্যাটক্লিফ পাল্টা অভিযোগ আনেন — রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা শিবির কিউবায় পরিচালিত হচ্ছে, এবং কিউবা আঞ্চলিকভাবে মার্কিন স্বার্থ বিঘ্নিত করছে।
র্যাটক্লিফের হাভানা ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফাঁস হয় বিস্ফোরক তথ্য।অ মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটররা সাবেক কিউবান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আনতে চাইছেন। ১৯৯৬ সালে ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ সংগঠনের দুটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তাঁর ভূমিকার অভিযোগে এই পদক্ষেপ।
৯৫ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো সহায়কের সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না। তবুও তাঁর বিরুদ্ধে যেকোনো আইনি পদক্ষেপ কূটনৈতিক সম্পর্কের ছেদ টানবে — এবং সম্ভবত সশস্ত্র সংঘাতের দ্বার উন্মুক্ত করবে। কিউবার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াবেন।
গত ১ মে শ্রমিক দিবসের সমাবেশে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল ঘোষণা দেন: “আমরা প্রস্তুত — এবং এই গভীর প্রত্যয় আমি আমার পরিবারের সঙ্গেও ভাগ করে নিয়েছি — বিপ্লবের জন্য জীবন দিতে।” রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণের দৃশ্য। কোনো ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, গরুর গাড়িতে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সোভিয়েত আমলের বিমানবিধ্বংসী কামান।
সামরিক ইতিহাসবিদ হ্যাল ক্লেপাক জানান, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের অভাব সত্ত্বেও কিউবার সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনগণ মিলে একটি কঠিন ভিয়েতনামীয় ধাঁচের গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।
দ্বীপটি জুড়ে এখন সংকটের ভয়াল ছবি। হাসপাতালে নেই ওষুধ, ফ্রিজে পচছে খাবার দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে, রাস্তায় জমছে আবর্জনার স্তূপ। মার্কিন জ্বালানি অবরোধের কারণে কিউবার শেষ তেলের মজুদও শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী। নতুন নিষেধাজ্ঞায় সামুদ্রিক পণ্য সরবরাহও ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যের দাম আরো আকাশ ছোঁয়ার পথে।
“আমাদের অর্ধেক মরলে মরুক — অন্তত বাকি অর্ধেক শান্তিতে বাঁচবে।”
— বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে রাস্তায় নামা এক হাভানাবাসী নারী বলেছেন।
কিউবার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের জন্য একটি ‘পারিবারিক নির্দেশিকা’ প্রকাশ করেছে — সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের মুখে কীভাবে টিকে থাকতে হবে তার পরামর্শ দিয়ে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক পরিবার যেন অ-পচনশীল খাবার ভর্তি একটি ব্যাগ তৈরি করে রাখেন।
কিন্তু সিএনএন-এর প্রতিবেদকের প্রতিবেশী এক কিউবান নাগরিক সব পরিকল্পনাকে তাচ্ছিল্য করে বললেন: “ওরা বলছে হারিকেনের মতো প্রস্তুতি নাও। কিন্তু আমাদের কাছে তো ইতিমধ্যে সবকিছু শেষ।”
