জেনারেল জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বেশীর ভাগ বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরীতে যোগ দেয়। তবে অন্যতম দুই ঘাতক কর্নেল ফারুক রহমান ও কর্নেল রশিদ, জিয়াউর রহমানের আনুকুল্য গ্রহন করেনি কারন তাদের উচ্চাকাঙ্খা ছিলো আরো তীব্র। এরা একবার ফিরে এসে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে সেনাবিদ্রোহ করারও চেষ্টা করেছিলো, সফল হয়নি।
চাকরী নেয়ার বদলে ফারুক ও রশিদ মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির ‘ভিআইপি অতিথি’ হিসেবে লিবিয়ায় বসবাস শুরু করে। গাদ্দাফির দেয়া ৭০ লাখ মার্কিন ডলার মূলধন নিয়ে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে খন্দকার আবদুর রশিদ। লিবিয়ায় তাদের শত শত মিলিয়ন ডলারের নির্মাণ প্রকল্প দেওয়া হয়। অন্যদিকে সৈয়দ ফারুক রহমান লিবিয়ার বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের ব্যবসার শুরু করে। শ্রমিক নিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে তরুণদের নিয়ে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষনও দেয়া হয়।
এই বিপুল অর্থ উপার্জনের ব্যবসায় পরবর্তীতে সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও অন্যতম সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে। এরশাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির একটি বড় অংশ দেওয়া হয় গেটকো (Getco) নামের একটি বাংলাদেশি কোম্পানিকে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ছিল ব্যবসায়ী মুসা, যে ‘প্রিন্স মুসা’ নামেও পরিচিত।
বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি গাদ্দাফী বাংলাদেশে তার “ইসলামিক সোশ্যালিজম” প্রচারের জন্য বুদ্ধিজীবিদের পেছনেও বিনিয়োগ শুরু করে। বাংলাদেশ-লিবিয়া ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি, মাসিক ইসলামিক টাইমস এবং ‘ব্রাদার গাদ্দাফি কিন্ডারগার্টেন স্কুল’ প্রকল্প চালু হয়। বাংলাদেশ-লিবিয়া ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি ১৯৭৭ সাল থেকে ঢাকায় ‘প্রগতি প্রিন্টার্স’ নামে একটি ছাপাখানা পরিচালনা করত। সেখানে মাসিক বুলেটিন ‘সবুজ অভিযান’ এবং গাদ্দাফির ‘গ্রিন বুক’-এর বাংলা সংস্করণ ছাপা ও বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো। অনুমান করা হয়, এই সব প্রকল্প চালাতে গাদ্দাফি প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করত। এই বুদ্ধিজীবি প্রকল্পের অন্যতম বেনিফিশিয়ারি ছিলেন আহমদ ছফা, ‘গ্রিন বুক’ তিনিই অনুবাদ করেছিলেন।
গাদ্দাফীর টাকায় ‘গণমাধ্যম’- এ বিনিয়োগও শুরু হয়। প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয় “ সাপ্তাহিক জনকথা”। সম্পাদক ছিলেন ইব্রাহিম রহমান। পত্রিকার টাকা আসতো আমেনা বেগমের হাত থেকে। সেই বিখ্যাত আওয়ামী লীগ নেত্রী যিনি আইয়ুব খানের আমলে বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকা অবস্থায় দলের হাল ধরেছিলেন, পরবর্তীতে সাধারন সম্পাদক পদ না পেয়ে পদত্যাগ করে আতাউর রহমান খানের সাথে ভীড়ে গিয়েছিলেন। এই পত্রিকায় খন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আতাউর রহমান খানদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ হতো নিয়মিত। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের প্রতি বিষোদ্গার করে নিয়মিত নিম্নমানের কলাম লিখতেন চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুক নামের একজন।
এরশাদ ক্ষমতা গ্রহনের পর ফারুক-রশিদ বাংলাদেশে আসে এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডও শুরু করে।প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি (প্রগশ), ১৫ আগস্ট বিপ্লবের আদর্শ বাস্তবায়ন- ইত্যাদি নামে ট্রায়াল শেষে ১৯৮৭ সালে তারা গঠন করে ফ্রিডম পার্টি। লিবিয়া থেকে সামরিক প্রশিক্ষন নিয়ে ফিরে আসা তরুণদের পাশাপাশি ঢাকা শহরের উঠতি মাস্তানরাও ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেয় অস্ত্র ও টাকার লোভে। এদের প্রধান টার্গেট ছিলো শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা।
১৯৮৪ সালে প্রকাশিত দৈনিক মিল্লাত, ১৯৮৭ সাল থেকে ফ্রিডম পার্টির মুখপত্র হয়ে উঠে। যথারীতি- বঙ্গবন্ধু হত্যা ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের মাহাত্ম্য প্রচার, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতি বিষোদ্গার হয়ে উঠে এই পত্রিকার প্রধান এজেন্ডা। এসময় পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সেই চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুক যিনি একই এজেন্ডায় “জনকথা”য় কলাম লিখতেন।
~~~~
সুত্রঃ
~~~
১। Gaddafi And The Killers Of Sheikh Mujibur Rahman – Analysis; Rajeev Sharma
২। পঁচাত্তরের খুনি চক্র ও এরশাদ; মিজানুর রহমান খান
৩। অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা; আলম রহমান
