সুষুপ্ত পাঠক
ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় সিনেমা প্রদর্শনে সরকার ও তৌহদী জনতার যৌথ বাধা ও ফারুকী অস্ট্রেলিয়ায় গোপনে পালিয়ে যাওয়া দুটি বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে আপনাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে বলব। স্মরণ করুন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জুনাইদ সাকি ও মাওলানা মামুনুল হক পাশাপাশি দুটি ড্রামের উপর দাঁড়িয়ে হাত ধরে জনতার উদ্দেশ্য ভি চিহ্ন দেখাচ্ছিলেন। এর কিছুদিন পর আনসার বাংলার জসিমউদ্দিনকে কোন রকম আইনী তোয়াক্কা না করে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হলো আর আর্মি তাকে সেল্যুট দিয়ে স্বগত জানালো। মনে আছে দৃশ্যগুলো?
মোটামুটি এসব দেখে জুলাইকে সমর্থন জানানো প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন বুঝে গিয়েছিল তাদের মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে। সেদিনই তারা জুলাইকে রাজাকার আল বদর জঙ্গিদের দ্বারা পরিচালিত বলে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে যারা জুলাই সমর্থক থেকে গেলো তারা সকলেই ডানপন্থী। আমরা এখন যেসব সিনেমা পরিচালক, অভিনয় শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের দেখি জুলাইপন্থী তারা সকলেই ডানপন্থী। মামুনুল হককে এই মুহূর্তে শরীয়া শাসন ঘোষণা করে তাকে খলিফা নির্বাচন করে দেন উনি বসেই সায়ানের মত বেশবাসের মহিলাকে ফাঁসিতে ঝুঁলাবে। কিন্তু সায়ান কিন্তু ডানপন্থী। একই সঙ্গে সে মৌলবাদী মানসিকতা যেমন গান হারাম এইসবের সঙ্গে একমত না। সে আবার নারীবাদীও। যেহেতু পৃথিবীতে ‘ইসলামী নারীবাদ’ বলতে একটা জিনিস আছে, ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ বলেও একটা জিনিস আছে কাজেই ডানপন্থী বলতে যে কট্টর রক্ষণশীলদের বুঝায় সেটা কেবল অন্য ধর্ম ও জাতিদের বিরুদ্ধে, তারা নিজ ধর্ম ও সম্প্রদায়ে বেশ লিবারেল। সলিমুল্লাহ খান ডানপন্থী বুদ্ধিজীবী তার সমস্ত কট্টর রক্ষণশীলতা ভারতীয় হিন্দুদের বিরুদ্ধে, হিন্দুদের বিরুদ্ধে, কিন্তু সলিমুল্লাহ তো ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় সিনেমা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে না। যদিও এরা মামুনুল হকদের সেফ এক্সট বা তাদের হয়ে ঝাড়ু চালায়, মানে মামুনুল হকদের নোংরামিকে তারা ঝাড়ু হাতে পরিস্কার করার দায়িত্ব নিবে সব দোষ পশ্চিমাদের উপর চাপিয়ে। কিভাবে? ফ্র্যান্সে যখন লরি তুলে বহু ফরাসিদের এক মুসলিম জঙ্গি হত্যা করলো সেই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সলিমুল্লাহ বলেছিল, এটা ফরাসিদের কোলনিয়াল যুগের যে অত্যাচার আলজেরিয়াতে চালিয়ে ছিল তার প্রতিক্রিয়া! ঝাড়ু মেরে রক্তের দাগ তারা এভাবেই পরিস্কার করে।
তো, জুলাইতে তারা দেখলো জেলখানা থেকে ফতোয়াবাজদের জাস্ট গেইট খুলে বের করে দেয়া হলো। সবগুলো জেলে ছিল ওয়াজে নারীদের বিরুদ্ধে, দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য রাখার জন্য। জেল থেকে ভয়ংকর সব জঙ্গিরা বেরিয়ে এলো সরকারী নির্দেশে। তখন তানিম নূরের মনে হয়নি তারা সিনেমা বানাতে আর পারবে কিনা? তিনি যে হাসনাত আবদুল্লাহকে ধন্যবাদ জানালেন তিনি কি জানেন না হাসনাত কোন গ্রুপের লোক? এই হাসনাতদের অনুমতি ছাড়া শত শত জিহাদী ফতোয়াবাজ ওয়াজী, জঙ্গিরা জেল থেকে মুক্ত হয়েছে? এরাই এখন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় সিনেমা নিষিদ্ধ করেছে। ঝগড়াটা এখন ডানপন্থী ডানপন্থীদের মধ্যে। ফারুকী, সৈয়দ জামিল, নজরুল একাডেমির লতিফুল ইসলাম শিবলী এরা সবাই ডানপন্থী। এরা কেউ সিনেমা নাটক বানায়, নাটক মঞ্চস্থ করে, গান লিখে কিন্তু তারা ডানপন্থী। তারা মুসলমান। তাদের মনে হয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এখানে ভারতীয় হেজিমিনি খেলা হয়েছিল। নজরুলকে তারা মুসলমানদের রবীন্দ্রনাথ মনে করে। এখানেই তারা ডানপন্থী। তাদের সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদীদের তখনই লাগবে যখন সিনেমা হারাম বলবে, গান হারাম বলবে, নজরুলকে কাফের বলবে। ফারুকী টেলিভিশন নামের একটা টেলিফিল্ম বানিয়েছিল না? সেটা ছিল গোড়ামীর বিরুদ্ধে। কিন্তু তার গোড়ামী ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে। হিন্দুতে, দেশভাগে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে। প্রো-পাকিস্তানী। ফলে তারা কেউ বিদেশে পালিয়েছে। বুঝে গেছে বোতল থেকে কওমি দৈত্য বেরিয়ে গেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ফেরার সময় এসে গেছে। যারা দেশে আছে তারাও কেউ মানবন্ধনে দাঁড়ায়নি কারণ ডানপন্থী হিসেবে তাদের হুংকার মৌলবাদের বিরুদ্ধে নয়, সেটা হিন্দু ভারত মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে।
কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সায়ানের গান বেরিয়েছিল এখন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় মোল্লাদের ফতোয়ার পর তার গান নেই কেন? রুমিন ফারহানার জন্যও তো গাইতে পারতো? গাইবে না। কারণ ছোট ছোট করে চুল ছাট আর শার্ট প্যান্ট পরে গিটার হাতে হেঁড়ে গলায় তার চেঁচামেচি প্রগতিশীলতার জন্য নয়, কট্টর ডানপন্থীদের মধ্যে সে লিবারেল পরিবেশ চায়। তার গানে সে বলেছে, ‘আমি মুসলমানের মেয়ে’, সে মুসলমানের মেয়ে কিন্তু গিটার নিয়ে গান গাইতে চায়। তার সমস্যা ভারত মুক্তিযুদ্ধ। তার সমস্যা ৭২ এর সেক্যুলার সংবিধান। কারণ সে মুসলমানের মেয়ে। একচুয়ালি এই রকম ঠগ বাছতে গেলে খোদ প্রগতিশীল শিবির বলতে যা আমরা যা বুঝি তাও উজাড় হয়ে যাবে এই বাংলাদেশে!
৫ আগস্টের আগে কি মৌলবাদের হুংকার ছিল না? তখনো কি সরকারীভাবে তারা সুবিধা পায়নি? অবশ্য ছিল এবং পেয়েছিল। কিন্তু একটা বড় পার্থক্য ছিল। মৌলবাদীরা তখন মনে করত সরকার তাদের নয়। এখন মনে করে পুরো বাংলাদেশটাই তাদের। হাসিনা এদের বিনাশ না করলেও বোতলে বন্দী করে রেখেছিল। এখন বোতল থেকে সব দৈত্যকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা নৃত্য করবে না? আপাতত ভূতের নৃত্য দেখুন! না হয় ফারুকীর মত ডলার কামিয়ে পালান! দেশটা শুয়োরের বাচ্চাদের হাতে দিয়ে সব পালান!
৪ জুন, ২০২৬
