কবির য়াহমদ
“বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে” শীর্ষক যে সংবাদ ভাইরাল হয়েছে—কষ্ট করে হলেও ওটা সত্য নয় বলে বিশ্বাস করতে চাই। তবে বিএনপির যে শিক্ষামন্ত্রী তিনি পোশাকআশাকে কেতাদুরস্ত হলেও চিন্তা-চেতনায় অনেকটাই ব্যাকডেটেড।
আজকের এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে পরীক্ষার হলে সনাতন পদ্ধতির ‘নকল’ থাকার দিন প্রায় শেষ, সেখানে কিছুদিন আগে নকল ধরার নামে তিনি যেভাবে নাটকীয় অভিযানের আয়োজন করে হাস্যরসের উপাদান হয়েছেন— তা সত্যিই নজিরবিহীন। খোদ শিশু-কিশোররাও তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলের পাত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে দেখে আমি অবাক ও কিছুটা ব্যথিত-বিস্মিত হয়েছি। যদিও শিশুদের এভাবে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে নিয়ে ট্রল করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং এটি করা ঠিক হয়নি বলেই আমি মনে করি।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর চিন্তার পশ্চাৎপদতার আরও একটা বড় প্রমাণ হলো, উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের তিনি পাকিস্তান পাঠানোর কথা বলছেন! এখানেই শেষ নয়, শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে এক সৌজন্য বৈঠকে তিনি অবলীলায় বলছেন— তারা যেন বড় হয়ে জাইমা রহমানের সাথে রাজনীতি করে। একজন শিক্ষামন্ত্রীর মুখে কোমলমতি শিশুদের দাস মনোবৃত্তির রাজনীতিমুখী করার এবং সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বংশানুক্রমের অনুসারী হওয়ার এই পাঠ দেওয়া অন্তত সুবিবেচনার নয় বলে মনে করছি।
মন্ত্রী হওয়ার পর পরই আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে এহসানুল হক মিলনের এক ধরনের অতি-উৎপাত লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ইদানীং অবশ্য সেই দৃশ্যমান উৎপাত কিছুটা কমেছে। তবে দৃশ্যমান উৎপাত কমলেও, এই ধরনের পশ্চাৎপদ মনস্তত্ত্বের মানুষ যখন সরকারের এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে আসীন থাকেন, তখন দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে ভয় ও শঙ্কা জাগাটাই স্বাভাবিক।
সরকারপ্রধান তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সমান ডিগ্রিধারী না হলেও তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, কারণ তিনি শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ওখানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দুজনকে রেখেছেন। কিন্তু শীর্ষ স্থানে যখন এহসানুল হক মিলনের মতো মানুষেরা বসে থাকেন, তখন সংখ্যার আধিক্যের চাইতে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক।
শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ; দুজনই দেখতে স্মার্ট, কথাবার্তাও বলেন সুন্দর করে। তবু তাদের দেখে মনে পড়ে কি পড়ে না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোতা কাহিনী’?
শুরু করে দিই পাঠ: “এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে। রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’ মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’ রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার। পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী। সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না।…”
সত্যি যদি বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে আমরা ‘তোতা কাহিনী’র পুনঃপাঠ করব
