সাভার ও আশুলিয়ায় শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে একযোগে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
ঈদের ছুটি শেষে গতকাল সকালে কাজে যোগ দিতে এসে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেখতে পান শ্রমিকরা। এই ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে এবং দুপুরের পর ভুক্তভোগীরা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনে নামেন।
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে সাভার পৌর এলাকার উলাইল মহল্লায় অবস্থিত একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকায় অবস্থিত প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যারের ৫২৯ জন এবং আশুলিয়ায় অবস্থিত আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে ৫৩ জন রয়েছেন।
ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আল-মুসলিম গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান।
শনিবার সকালে উলাইল ও রেডিও কলোনি এলাকার দুটি কারখানার সামনে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের বড় ভিড় জমে যায়। অনেক শ্রমিক কারখানার ফটকের পাশে টানানো তালিকায় নিজেদের নাম খুঁজতে থাকেন।
শ্রমিকরা জানান, ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে এসে দেখেন তাদের আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং কারখানায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অনেকের কাছে আগে থেকে মোবাইলে বার্তা পাঠিয়েও ছাঁটাইয়ের বিষয়টি জানানো হয়।
সুইং অপারেটর মাকসুদা আক্তার বলেন, “সকালে অফিসে গিয়ে যখন কার্ড পাঞ্চ করতে গিয়েছি, তখন দেখি আমার পাঞ্চ নিচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ আমাদের পাওনা টাকা-পয়সা না দিয়েই জোর করে কারখানা থেকে বের করে দিয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কোথায় চাকরি পাব, কিভাবে চলব।”
১৩ বছর ধরে সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত আফানুর জানান, হঠাৎ মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সকালে কাজে এলে কর্তৃপক্ষ তাকে কারখানায় ঢুকতে দেয়নি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ৭ বছর ধরে কর্মরত রোজিনা আক্তার, ২ বছর ৫ মাস ধরে কর্মরত মো. রকিবুল্লাহ এবং ট্রেনিং সেন্টার থেকে সদ্য লাইনে আসা আছিয়া আক্তার।
শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় শ্রম আইনের বিধান যথাযথভাবে মানা হয়নি। তারা বলেন, ছাঁটাইয়ের আগে ঈদের ছুটির আগে মাত্র ২০ দিনের বেতন দেওয়া হয়। পরে ছাঁটাই করে এক মাসের বেতন পরিশোধ করা হলেও বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী তিন মাসের বেতন পরিশোধের দাবি তাদের।
তারা আরও প্রশ্ন তোলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণ দেখালেও বাস্তবে নিয়মিত ওভারটাইম করতে হচ্ছিল, যা ওই যুক্তিকে সন্দেহজনক করে তোলে।
একাধিক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২০ ধারা অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারলেও, ২১ ধারা অনুসারে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পরবর্তীতে প্রয়োজন সাপেক্ষে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “কারখানায় অতিরিক্ত শ্রমিক হলে যাদেরকে সবশেষে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ছাঁটাই করতে হবে। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ ৫ থেকে ১০ বছর এবং তারও অধিক সময় ধরে চাকরি করা শ্রমিকদেরকে ছাঁটাই করেছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি আদায়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এই বিষয়ে আল-মুসলিম গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবু রায়হান বলেন, শ্রমিকদের ২০ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে এবং পাওনা এক মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে।
তিন মাসের বেতন পরিশোধের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, “তিন মাসের বেতন আমরা দেব না।”
তবে যারা এক মাসের বেতনও পাননি, তাদের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শ্রমিকদের শান্ত করেছে। মালিকপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে এবং মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ভুক্তভোগী শ্রমিকরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
