মনজুরুল হক
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী ১৩ জুন শুক্রবার স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদীকে সঙ্গে নিয়ে বেনাপোল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সেসময় তিনি স্বাভাবিক সৌহার্দ্য ও সৌজন্যমূলক দুচারটে কথা বলেছেন, ব্যাস! তা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষাঘাতগ্রস্থ রাজনীতির বৈঠকখানায় হাতি-ঘোড়া মা/রা শুরু হয়েছে।
▪️
মিডিয়া লিখছে, ‘ভারতের নতুন হাই কমিশনার কি অখন্ড ভারতের ইঙ্গিত দিলেন?’ না, তিনি কোনও ইঙ্গিত দেননি। তিনি স্রেফ সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি দেখানোর জন্য চেকপোস্টে একজন সাংবাদিক দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ভিসা আবার কবে চালু হবে জানতে চাইলে বলেন, “আমি একটাই কথা বলতে পারি; আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি, আর আমি কুঁড়ি কোটি অ্যাড করি, তাহলে ১৬০; …তাহলে যা হবে, একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে আমি ভাবছি–আমার মনে ওইটা ঢুকছেই না।
“দেখুন তো হেঁটে চলে এলাম, মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশি না। …সবসময় আমি বলি একই আকাশ একই বাতাস…।”
▪️
এই বক্তব্য নিয়ে আপনি হাতি-ঘোড়া-গণ্ডার-সাঁজারু মা/রতেই পারেন। চায়ের কাপে ঝড় তুলতে পারেন, কিন্তু দিন শেষে এটা স্রেফ এবং স্রেফ ডিপ্লোম্যাটিক জেশ্চার।
এই কথাটিই যদি পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত কাজে যোগ দিতে এসে বলত তাহলে কেউ ভিন্ন মানে খুঁজতে যেত না। এমনকি আমেরিকান রাষ্ট্রদূতদের অনেকেই অনেক সময় কূটনৈতিক বেড়াজাল পেরিয়ে অনেক কিছু করে বসেন, বলে বসেন। তখন তা নিয়ে কারও উল্টিব্যামো কিংবা পেট কামড়ানি ওঠে না। চুকা ঢেকুরও না।
▪️
ভারতীয় নবাগত হাই কমিশনারের বক্তব্য নিয়ে জামায়াত নেতা ক্লারিফিকেশন দাবী করেছেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপও ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তথ্যমন্ত্রী আগ বেড়ে বলেছেন, “বাঙালি পরিচয়ের জন্য সীমান্তের ওপারের কারও সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই”।
অর্থাৎ জনাব জহির উদ্দিন স্বপন অলরেডি দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যকে রাজনৈতিক ধরে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বসেছেন।
▪️
২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়।
এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ শুরু হয় দুই তরফেই, বিশেষ করে ভারতের পক্ষ থেকে অনেকটা গায়ে পড়ে বন্ধুত্বের উদ্যোগ চোখে পড়ে। বেগম খালেদার অন্তেষ্টিক্রিয়ায় ভারতের হেভিওয়েট পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ বার্তা বয়ে আনেন। সেসময় ভারতের গদি মিডিয়া এবং ‘জেনুইন’ মিডিয়ায় সেকি হাইপ! সব ‘ডিম’ আওয়ামী লীগ ঝুড়িতে না রেখে বিএনপি ঝুড়িতেও ভাগ করে রাখার পলিসি নিয়ে ভারতের ইউটিউবাররা রাত-দিন প্রশংসাচর্চায় গলদঘর্ম হতেন। এমনকি তাদের কয়েকজন তারেক রহমানের মধ্যে ‘ডাইনামিক’ লিডারের সকল গুণাবলি আবিষ্কারও করে বসেছিলেন। সেই হাইপ বেশিদিন থাকেনি। তারেক মুচকি হেসে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘গহিরা দোস্তি’ বজায় রেখে ভারতকে খুলে আম নতিজা বুঝিয়েছিলেন।
▪️
সেই ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আরও ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারত প্রমাদ গোণে। এখন সেই ড্যামেজ কন্ট্রোল করার জন্য পিওর ডিপ্লোম্যাট বাদ দিয়ে ঝানু পলিটিশিয়ান কাম ডিপ্লোম্যাট দীনেশ ত্রিবেদীকে পাঠিয়েছে ভারত, যার মূল এজেন্ডা চোট খাওয়া সম্পর্ক জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা। ঢাকা ও দিল্লির দূরত্ব ঘোচানোর ‘কূটনীতিতে’ দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন বলে মনে করছে দিল্লি।
▪️
প্রবীণ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আশির দশকে ছিলেন কংগ্রেস নেতা। পরে ১৯৯০ সালে জনতা দলে চলে যান। ১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তিনিই দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক।
২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের এমপি, ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী, ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান দীনেশ। ২০২১ সালে ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।
▪️
অর্থাৎ এই লোক পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির হাঁড়ির খবর রাখেন। সেই তিনি যদি সম্পর্ক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে ‘একই আকাশ, একই মাটি’র কথা বলেন তাহলে কি অন্যায় করেছেন মাথায় আসে না।
▪️
অবশ্য বাংলাদেশে একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর রাজনীতির মূল খাদ্যই হলো ভারত বিরোধীতা। তারা দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যটি হটকেক বিবেচনা করে পানি ঘোলা করবে। আজকে যদি কোনও দৈব কারণে ভারত নামক রাষ্ট্রটি মানচিত্র থেকে ‘নেই’ হয়ে যায় তাহলে কালকেই এইসব রাজনৈতিক দলের এবং ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগানদাতাদের ‘পলিটিক্যাল ডেথ’ হয়ে যাবে। এদের রাজনীতির গাছে সার-পানি-সেচ দেওয়ার জন্য ভারতকেও থাকতে হবে এবং মাঝে মাঝে দীনেশ ত্রিবেদীর মত কারও সৌহার্দ্যপূর্ণ বক্তব্য দিতে হবে।
▪️
আর যদি কেউ মনে করেন ভারতের একটা দুরভিসন্ধি না থেকে পারে না। তাহলে তাকেও দোষ দেওয়া যাবে না। যে কোনও ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশের বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী হলে ওই ক্ষুদ্র দেশের একাংশের মানুষের মনে সবসময়ই নিরাপত্তা সংশয় থেকে যায়। তার উপর সেই বৃহৎ দেশটি যদি হিন্দু অধ্যুষিত হয় তাহলে তো কথাই নেই…. ও ব্যাটার মতলব ভালো না!
▪️
সর্বশেষ; ভারত যদি মনেই করে যে তারা একসময়কার গ্রেটার ইন্ডিয়া ফিরিয়ে আনবে তাহলে সেটাও দোষনীয় কিছু নয়। একটা শক্তিশালী দেশ তাদের দেশটিকে হাজার বছর আগেকার ‘গ্রেটার’ অবস্থায় দেখতে চাইতেই পারে। তাছাড়া ইউনূস গংয়ের স্যাঙ্গাতরা যেমন ‘গ্রেটার বাংলা’র ম্যাপ এঁকে ভারতের কয়েকটি রাজ্যকে এই দখল করে সেই দখল করে অবস্থা করেছিল তখন কি কেউ প্রশ্ন তুলেছিল যে এর ব্যাখ্যা চাই? না, তখন সক্কলেই স্পিক্টিনট।
▪️
আজকে যদি সত্যিই ভারতর পলিসি মেকাররা মনে করে ‘গ্রেটার ইন্ডিয়া’ গড়ে তুলবে তার বীজ কিন্তু বর্তমান শাসকদের নয়। ১৯৪৭-এর আগে-পরে জওহরলাল নেহেরু এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। নেহেরু একটি অখণ্ড ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের কথা বলেছিলেন। তাঁর চিন্তা বা দর্শন মূলত দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল; এক- ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা: নেহেরু তাঁর ‘দ্য ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’ (The Unity of India) এবং ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ (Discovery of India) বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন যে, হাজার বছর ধরে ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভারত একটি সুসংহত অঞ্চল ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই প্রাকৃতিক অখণ্ডতা বজায় থাকলে ভারত বৈচিত্র্যের মাঝে তার নিজস্ব শক্তি খুঁজে পাবে। দুই-ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা: তিনি মনে করতেন, অখণ্ড ভারতবর্ষের ধারণাটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, ভারতের সকল ধর্মের ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানই দেশের প্রকৃত শক্তি।
▪️
আমরা জানি না দীনেশ ত্রিবেদী এরকম কোনও সিলসিলা নিয়ে এসেছেন কীনা? তবে তাই যদি হয় তাহলে বাংলাদেশের এইসব অতিচিন্তকদের উচিৎ হবে ইউনূসের রিসেট বাটনে ফের চাপ দিয়ে ১৯৪৭-এ ফেরৎ গিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করা।
▪️
আমার ব্যক্তি অভিমত হচ্ছে দীনেশ ত্রিবেদী এক বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশি তাওয়ার উত্তাপ দেখে ফেলেছেন। এবার যখনই তার মনে হবে একটু আলোচনায় আসা যাক…. তখনই এমন কোনও সাদাসিদে মন্তব্য করবেন এবং বাঙ্গু মোস্ট ক্রিয়েটিভ পটেটো থিঙ্কাররা দশটা কাউন্টার বক্তব্য ঝেড়ে দেবেন…. ইটস কলড উই হ্যাভ আ প্ল্যান! এসবই হচ্ছে পঙ্গু রাজনীতির ফুয়েল।
