Close Menu

    সাবস্ক্রাইব

    সর্বশেষ খবরের সাথে আপডেট থাকুন।

    জনপ্রিয় সংবাদ

     “বন্যাদুর্গত মানুষের সাথে সরকার উপহাস করছে”— বিবৃতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের

    July 14, 2026

    বিয়ের সাক্ষী যখন পোষা কুকুর

    July 14, 2026

    ইরানের ওপর আবারও মার্কিন নৌ অবরোধ, জাহাজ থেকে টোল নেওয়ারও ঘোষণা ট্রাম্পের

    July 14, 2026
    Facebook Instagram WhatsApp TikTok
    Facebook Instagram YouTube TikTok
    JoyBangla – Your Gateway to Bangladesh
    Subscribe
    • হোম পেইজ
    • বিষয়
      • দেশ (Bangladesh)
      • আন্তজাতিক (International)
      • জাতীয় (National)
      • রাজনীতি (Politics)
      • অথনীতি (Economy)
      • খেলা (Sports)
      • বিনোদন (Entertainment)
      • লাইফ স্টাইল (Lifestyle)
      • শিক্ষাঙ্গন (Education)
      • টেক (Technology)
      • ধম (Religion)
      • পরবাস (Diaspora)
      • সাক্ষাৎকার (Interview)
      • শিল্প- সাহিত্য (Art & Culture)
      • সম্পাদকীয় (Editorial)
    • আমাদের সম্পর্কে
    • যোগাযোগ করুন
    JoyBangla – Your Gateway to Bangladesh
    Home » মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা কেন মুক্তিযোদ্ধা সাজছে
    Bangladesh

    মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা কেন মুক্তিযোদ্ধা সাজছে

    JoyBangla EditorBy JoyBangla EditorJune 26, 2026No Comments15 Mins Read
    Facebook WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook WhatsApp Copy Link

    আখতারুজ্জামান আজাদ

    বিগত দুই-তিন দশকে বাংলাদেশে যিনিই যেখানে মুক্তিযুদ্ধের কথা উচ্চারণ করেছেন, তাকেই কোনো-না-কোনোভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে ‘চেতনাব্যবসায়ী’ বা ‘চেতনাজীবী’ খেতাব দিয়ে হেয় করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চরিত্রহনন করে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা বিকল্প উপায়ে বিভীষিকা তৈরি করে তার জীবন বিপন্ন করা হয়েছে। কেউ মুক্তিযুদ্ধের কথা উচ্চারণ করলেই তার উদ্দেশে তেড়ে এসে বলা হয়েছে যে, তিনি ‘ভারতীয় বয়ান’ উৎপাদন করছেন। আরও বলা হয়েছে— মানুষ এখন আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প খায় না, মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে দেশকে আর বিভক্ত করা যাবে না, মুক্তিযুদ্ধ এখন বহু বছরের পুরোনো পরিত্যক্ত গণ্ডগোল। বিশেষত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি পায়ের তলায় শক্ত মাটি খুঁজে পেয়েছে এবং ৫ আগস্টের সরকারপতনের ঘটনাকে প্রচার করেছে ‘নতুন স্বাধীনতা’ বলে, সরকারপতন-পরবর্তী বাংলাদেশকে ‘বাংলাদেশ ২.০’ বলে এবং ৫ আগস্টকে ‘নতুন বিজয়দিবস’ বলে। মুক্তিযুদ্ধের যত স্মারকভাস্কর্য ভাঙা সম্ভব, সব ভেঙে ফেলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এই ভূখণ্ডকে একাত্তর-পূর্ববর্তী সময়ে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেছে। ১৯৪৭ ও ২০২৪-কে মাত্রাতিরিক্ত মহিমান্বিত করে চেষ্টা করেছে ১৯৭১-কে ম্লান করে দিতে এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের নামোচ্চারণকেও ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে।

    এখানে একটি চাঞ্চল্যকর ব্যাপার প্রণিধানযোগ্য। সেটি হলো, কেউ মুক্তিযুদ্ধের কথা সামনে আনলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি তাকে যেকোনো মূল্যে চুপ করিয়ে দেয় এবং তাকে মুক্তিযুদ্ধব্যবসায়ী হিশেবে আখ্যায়িত করে; পক্ষান্তরে সেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিই বছরের বারো মাস মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলে। দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যখন কোনো কথাই হয় না, দেখা যায় তখনই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীপক্ষের কেউ মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কোনো-না-কোনো ব্যাপারে মিথ্যাচার করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। তখন কেউ সেই মিথ্যাচার খণ্ডন করতে এলে তাকে ‘চেতনাজীবী’ আখ্যা দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়; তাকে উপদেশ দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎবিভ্রাট, মশার প্রাদুর্ভাব, সড়কদুর্ঘটনা, নদীভাঙন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির চাওয়া হলো— মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে টুঁ শব্দ করবে না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাপারে বিতর্ক তৈরি করে নিজেদের একাত্তরের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেবে কিংবা ভুলিয়ে দেবে। এরই অংশস্বরূপ তারা সুযোগ পেলেই প্রচার করে ৭ মার্চের ভাষণের শেষে শেখ মুজিবুর রহমান ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাজউদ্দিন আহমদ কোলকাতায় বসে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (এবং বাহাত্তরের সংবিধান) ভারত লিখে দিয়েছে, ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী, ভারত ষড়যন্ত্র করে ১৬ ডিসেম্বর আতাউল গনি ওসমানিকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেয়নি, পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুধু ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা তিন লাখ, ১০ জানুয়ারি দিল্লি ও কোলকাতা হয়ে দেশে ফেরার সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানও ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আরেক দফা দেশ বিক্রি করে এসেছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ফসল।

    এখানে একটি লোমহর্ষক ব্যাপার আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভারতের চক্রান্ত বলে; নিজেদেরকে তারা কেউই ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলেও স্বীকার করে না, ‘রাজাকার’ বলেও স্বীকার করে না, বরং দাবি করে ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’ হিশেবে। অর্থাৎ যে-মুক্তিযুদ্ধ ‘ভারতের চক্রান্ত’, যে-মুক্তিযোদ্ধারা ‘ভারতের দালাল’; মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি নিজেদেরকে দাবি করে সেই ভারতীয় দালাল পরিবারের সদস্য হিশেবেই। পঞ্চান্ন বছর ধরে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেও যেহেতু মুক্তিযুদ্ধকে স্থানচ্যুত করা যায়নি, সেহেতু নিজেদেরকে ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’ হিশেবে দাবি করা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। বাঙালি-গণহত্যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং আরও নানান ধরনের সামরিক, বেসামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী গঠন করলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ঐসব বাহিনীর পরিচয় ১৬ ডিসেম্বরের পর আর কখনওই ব্যবহার করেনি। কেননা, ঐসব বাহিনীর পরিচয়কে বাংলাদেশের বুকে কখনওই গৌরবজনক হিশেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ধারণা করেছিল এখন থেকে নতুন প্রজন্মের কাছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হবে, একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল প্রজন্ম এ নিয়ে টানাহেঁচড়া করবে না এবং একাত্তরের গণহত্যাকারীদেরকে বাংলাদেশের বুকে ‘বীর’ হিশেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। রাজাকারদেরকে ‘বীর’ হিশেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে তারা যতবারই ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করেছে, তখনই প্রকৃত ইতিহাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামনে উঠে এসে তাদের স্বরূপ আরও বেশি উন্মোচন করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিও শেষতক আশ্রয় নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধেরই কোলে।

    উদাহরণস্বরূপ, জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে একাত্তরে একটি গণহত্যাকারী সংগঠন হিশেবে আবির্ভূত হলেও এর বর্তমান আমির মো. শফিকুর রহমান নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’ হিশেবে দাবি করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাঁচদিন আগে— ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জের একটি নির্বাচনী সমাবেশে শফিক বলেছেন— ‘আমি বিশ্বাস করি, এখানে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাও আছেন অথবা তাদের সন্তানেরা আছেন। আমিও এক শহিদ মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য। আমার যে-ভাই জীবন দিয়েছেন, আমি বিশ্বাস করি এমন বাংলাদেশের চিত্র দেখলে তিনি হয়তো সেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন না।’ এই ‘ভাই’ শফিকের কেমন ভাই, সেই ‘ভাই’ কবে কোথায় কীভাবে শহিদ হয়েছেন, দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় মুক্তিযুদ্ধে নিহত হলেই নিজেকে মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য বলে দাবি করা যায় কি না; এর উত্তর শফিকদের কাছ থেকে কোনোকালেই পাওয়া যাবে না। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দৈনিক যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিক বলেছেন— ‘যখন সত্তরের নির্বাচন হয়, তখন আমরা স্কুলের ছাত্র। তখন ছিল লেটারপ্রেস। ঐ অক্ষরগুলো বসিয়ে-বসিয়ে ছাপাখানায় ছাপত। তখন পোস্টারগুলিও ছাপা হতো।  সত্তরের নির্বাচনের সময়ে নৌকার সিল বানিয়ে আনা হয়, আর পোস্টারগুলো আমরা হাতে লিখতাম। আমাদের চেয়ে যারা সিনিয়র, তারা সেগুলো লাগাইতো। সেই অর্থে আমি ছাত্রলিগের সত্তরের হাতে-লেখা পোস্টারের কর্মী।’

    জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ‘ইসলামি ছাত্রসংঘ’ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আলাদা কিলিং স্কোয়াড ‘আল-বদর’ গঠন করেছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করার জন্য। ১৯৭১ সালে ছাত্রসংঘ এতটাই কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল যে, স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামি স্বনামে রাজনীতিতে ফিরে আসতে সক্ষম হলেও ছাত্রসংঘ তা পারেনি। জামায়াতে ইসলামি যেমন একেক সময়ে একেকটি বা একইসাথে অনেকগুলো রাজনৈতিক দোকান খুলে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর সেসব দোকান বন্ধ করে দেয়, স্বনামে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করা অসম্ভব হয়ে পড়ার কারণে ছাত্রসংঘকেও জামায়াতে ইসলামি মুক্তিযুদ্ধের পর স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্রসংঘেরই নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ইসলামি ছাত্রশিবির নামে নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যারা ছাত্রসংঘ করেছেন, তাদের কেউই এখন আর ঘুণাক্ষরেও স্বীকার করেন না যে, তারা ছাত্রসংঘ করতেন। জামায়াতের আমির মো. শফিকুর রহমান এখন নিজেকে ‘ছাত্রলিগের সত্তরের হাতে-লেখা পোস্টারের কর্মী’ বলে সগৌরবে প্রচার করছেন। জামায়াতের একজনও নিজেকে ছাত্রসংঘের কর্মী বলে স্বীকার না-করলেও জামায়াতের আমির নিজেকে ঠিকই ছাত্রলিগের কর্মী হিশেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। এর একমাত্র কারণ, ছাত্রলিগ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। ফলে, জামায়াতের আমিরের এখন ছাত্রলিগ-পরিচয় জরুরি হয়ে পড়েছে, ছাত্রসংঘ-পরিচয় নয়। কারও ছাত্রসংঘ-পরিচয় এখন লজ্জার। কেউ এই পরিচয় আর কখনওই ব্যবহার করবে না। এজন্যই জামায়াত ছাত্রসংঘকে বেঘোরে বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

    জামায়াতে ইসলামির নায়েবে আমির, বর্তমান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আবদুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ তাহের ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল সংসদে বলেছেন— ‘আজকাল আমাদেরকে খুব বেশি করে রাজাকার-আলবদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই যে আমরা এখানে (জামায়াতের সাংসদরা) বসে আছি, আমরা তো কেউ রাজাকার ছিলাম না, আল-বদরও ছিলাম না। যদি আপনারা সেভাবে মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেন, তবে আমিও একজন শিশু মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের বাড়ি ছিল বর্ডারের কাছে এবং বাড়িটি বেশ বড় ছিল। যারা ইন্ডিয়ায় মাইগ্রেট করতে যেতেন, তারা প্রথমে আমাদের ওখানে এসে আশ্রয় নিতেন। আমরা তাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতাম। এ ছাড়া, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে কি না, তা আমরা পাহারা দিতাম। যখন সেনারা দূরে থাকত, তখন আমরা গাইড করে মানুষকে ইন্ডিয়া পার করে দিতাম।’

    আবদুল্লাহ্‌ তাহেরের এই বক্তব্যের মধ্যে তিনটি ব্যাপার উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, তাহের দাবি করেছেন যে, ভারতগামী বাঙালি শরণার্থীদেরকে তাহেরদের পরিবার সীমান্ত পেরোতে সহযোগিতা করত। মুক্তিযুদ্ধের সাথে নিজেদেরকে ইতিবাচক সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে গিয়ে জামায়াতনেতারা অতীতে যে যা বলেছেন, পরমুহূর্তেই এর সবকিছু মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে বিধায় তাহেরের এই দাবিও প্রশ্নাতীতভাবে বিশ্বাসযোগ্য না। দ্বিতীয়ত, তাহের দাবি করেছেন জামায়াতের সাংসদদের মধ্যে কেউ আল-বদর ছিলেন না। বাস্তবতা হলো, জামায়াতের বর্তমান সাংসদদের মধ্যে এটিএম আজহারুল ইসলাম ১৯৭১ সালে ছাত্রসংঘের রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন, সেইসাথে ছিলেন আল-বদর বাহিনীর রংপুর জেলার নেতৃত্বেও। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছিল, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বেকসুর মুক্তি পান। আওয়ামি লিগ সরকারের অস্বাভাবিক পতন না-হলে আজহারকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখিই হতে হতো, যেভাবে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন আল-বদর বাহিনীর দুই শীর্ষনেতা— জামায়াতে ইসলামির সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামি এবং সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলি আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তৃতীয়ত, তাহের নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করেছেন এবং একইসাথে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভারতের চক্রান্ত’ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘ভারতের দালাল’ সাব্যস্ত করে থাকে। ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে, জামায়াতেরই হিশেব অনুযায়ী, তাহের নিজেকে ‘ভারতের শিশু দালাল’ হিশেবে স্বীকার করে নিলেন। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে জামায়াত যা-ই বলে, জামায়াত তাতেই বিপদে পড়ে।

    নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’ বানাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন এবং দলের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপত্তি ঘটিয়েছেন আবদুল মুন্তাকিম। নীলফামারী-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামির এই সাংসদ ২০২৬ সালের ১৪ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহিদ। আমার আব্বারা সাত ভাই— চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা উনিশজন— এগারোজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে সাতচল্লিশজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা। কিন্তু আমি আজকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই কেউ অনেক কিছু বলে ফেলে। আমি বলতে চাই, মাননীয় স্পিকার, দুই সারিতেই মুক্তিযোদ্ধারা আছেন— ট্রেজারিতেও আছেন, বিরোধীদলেও আছেন। সবাই মিলে আমাদের এই দেশ গড়তে চাই। মুক্তিযুদ্ধের সেটেলড ইশু নিয়ে আর যেন কথা না-হয়।’ কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, মুন্তাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে। ১৯৭১ সালে শহিদ হওয়া কোনো ব্যক্তির ছেলে ১৯৮১ সালে কীভাবে জন্ম নেয়, এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামাশা শুরু হওয়ার পর আবদুল মুন্তাকিম পত্রপত্রিকাকে জানিয়েছেন যে, তার ‘স্লিপ অব টাং’ হয়েছে। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তার বাবা মারাই যাননি, এখনও বেঁচে আছেন। বিদ্রুপে অতিষ্ঠ হয়ে আবদুল মুন্তাকিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন— ‘আমার দাদা একজন শহিদ। তিনি আমার বাবার চাচা ছিলেন। আমি আক্ষরিক অর্থে এটা বোঝাতে চাইনি যে, আমার বাবা একজন শহিদ ছিলেন। আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে, আমার দাদা-দাদির মধ্যে শহিদ আছেন।’ মুন্তাকিম আরও জানিয়েছেন— ‘সংসদ অধিবেশন চলাকালে আমি অসুস্থ ছিলাম, মাথায় ছিল প্রচণ্ড ব্যথা। সংসদে কী বলেছি, তা বুঝতে পারছি না।’ যে-মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামির বিদ্বেষ এখনও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান, সেই মুক্তিযুদ্ধেরই স্টেকহোল্ডার হওয়ার জন্য জামায়াতনেতারা নিজেদের জীবিত বাবাকেও মুক্তিযুদ্ধের শহিদ বানিয়ে দিতে ছাড়ছেন না, বানাতে গিয়ে গুবলেট পাকিয়ে বলছেন— আমার মাথায় ছিল প্রচণ্ড ব্যথা।

    দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার ফলে একটি অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। সেটি হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখনই কেউ মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আলোচনা করে, তখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এসে প্রথমেই যে-বাক্যটি দিয়ে কথোপকথন শুরু করে, সেটি হলো— ‘আমার দাদাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কিন্তু সনদ নেননি, দাদু সনদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেননি’। বলাই বাহুল্য, তাদের প্রত্যেকের দাদাই জামায়াতনেতা আবদুল মুন্তাকিমের বাবা ও দাদার মতো ‘মুক্তিযোদ্ধা’। আরও একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা, অকাট্য প্রমাণ থাকার কারণে, যারা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারেন না; তারা অবধারিতভাবেই বলে থাকেন— ‘রাজনৈতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধের সময়ে কোনো হত্যাকাণ্ড বা লুটতরাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না; বরং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে সুসম্পর্ক রেখে এলাকার মেয়েদের ইজ্জত বাঁচিয়েছি, হিন্দুদেরকে রক্ষা করেছি, বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়েছি।’ অর্থাৎ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের কেউই পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেননি, পাক সেনাদের হাতে বাঙালি মেয়েদেরকে ভোগের সামগ্রী হিশেবে তুলে দেননি, রাজাকারবাহিনী বা শান্তি কমিটিতে নাম লিখিয়ে পাক সেনাদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দেননি, নিজেরা অংশ নেননি স্বজাতিহত্যায়; সকলেই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন, হিন্দুদেরকে বুকে আগলে রেখেছিলেন, বাঁচিয়েছিলেন তরুণীদের ইজ্জত। বলাই বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পরাজিত হলে এরাই যারপরনাই বীরত্বের সাথে প্রচার করতেন কে কীভাবে কয়জন মুক্তিযোদ্ধাকে খতম করেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কয়জন আত্মীয়াকে অপহরণ করে পাকিস্তানিদের মনোরঞ্জনের জন্য সেনাক্যাম্পে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন।

    ২০২৪ সালের কোটা-আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী স্লোগান হয়ে উঠেছিল ‘তুমি কে, আমি কে— রাজাকার রাজাকার’। সাংবাদিকসম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা-আন্দোলনকারীদেরকে প্রকারান্তরে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলার পরিপ্রেক্ষিতেই এই স্লোগানের জন্ম হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। অবশ্য পরবর্তীকালে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন নেতাকর্মী এই স্লোগান প্রথমবার দেওয়ার কৃতিত্ব দাবি করেছেন। ছাত্রশিবিরের কৃতিত্ব দাবি করার অর্থই হলো ছাত্রশিবির এই স্লোগান শেখ হাসিনার উল্লিখিত উক্তির রিভার্স হিশেবে ব্যবহার করেনি; বরং নিজেদেরকে মনেপ্রাণে ‘রাজাকার’ ভেবে এবং পূর্বপুরুষদের রাজাকারপরিচয়কে মহিমান্বিত করার জন্যই ছাত্রশিবির এই স্লোগান দিয়েছিল। আন্দোলনে এই স্লোগান তাৎক্ষণিকভাবে কাজে এসেছিল, আন্দোলন বেগবান হয়েছিল, আন্দোলনের গুপ্ত উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পর জামায়াতে ইসলামি থেকে বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে এই মর্মে যে, ‘রাজাকার’ শব্দটি এখন আর কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়, রাজাকারপরিচয় কোনো লজ্জাজনক পরিচয় নয়, এই শব্দটি এবং এই পরিচয় বরং গৌরবের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জামায়াত বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের কোনো সাবেক বা বর্তমান নেতা বা কর্মী এখনও নিজেকে ‘রাজাকার’ বলে পরিচয় দিতে ইচ্ছুক না, এমনকি ৫ আগস্টের পরেও না। জামায়াতের কাউকে ‘রাজাকার’ বলা হলে এখনও জামায়াত সংঘবদ্ধভাবে তেড়ে আসে। জামায়াতের নেতাকর্মীরা এখন নিজেদেরকে বরং ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’ বলে পরিচয় দিতেই আগ্রহী। কারণ, অযুত চেষ্টা করেও বাংলাদেশের বুকে রাজাকারপরিচয়কে গৌরবজনক হিশেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, লজ্জাজনক হিশেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি মুক্তিযোদ্ধাপরিচয়কে। পঞ্চান্ন বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ দোর্দণ্ডপ্রতাপে দেদীপ্যমান একান্ত আপন আলোয়।

    ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ মাঠে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামির সামাজিক সংগঠন আল-ইসলাম ট্রাস্ট আয়োজিত মাহফিলে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মিজানুর রহমান বলেছেন— ‘রাজাকার-রাজাকার গালি দেওয়ার দিন শেষ। কী দিন আসলো, আল্লাহ্‌ আমাদের দেখাইছে। রাজাকার শব্দটা এখন অ্যাওয়ার্ড হয়ে গেছে। পরিস্থিতি পালটে দিতে আল্লাহ্‌র সময় লাগে না, চিল্লায়ে বলেন ঠিক কি না।’ জামায়াতে ইসলামির ধর্মীয় বক্তা মিজান মাত্রই গতবছর বললেন রাজাকার শব্দটি এখন ‘অ্যাওয়ার্ড’-এ পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরের বছরই সেই ‘রাজাকার অ্যাওয়ার্ড’ আর কেউ নিতে চাইছেন না, বরং রাজাকাররাও যেকোনো মূল্যে রাজাকারপরিচয় লুকোতে চাইছেন, চাইছেন নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য হিশেবে জাহির করতে। যে-মিজান দাবি করেছেন রাজাকারপরিচয় এখন অ্যাওয়ার্ড, খোদ মিজানকেই কেউ এই অ্যাওয়ার্ড দিতে চাইলে মিজান নিঃসন্দেহে তা নেবেন না, বরং অ্যাওয়ার্ডদাতাকে চার-পাঁচ ভাষায় কাফের আখ্যা দিয়ে সোজা দোজখে পাঠিয়ে দেবেন। ভাষাগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, আরবি ও ফারসি। এর মধ্যে ইংরেজির আধিক্যই বেশি থাকবে। অর্থাৎ রাজাকারপরিচয় স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনওই অ্যাওয়ার্ডে পরিণত হয়নি; বরং দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরিচয় হিশেবে আগেও পরিগণিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে।

    ২০০১ সালে চট্টগ্রামের এক ওয়াজ মাহফিলে জামায়াতে ইসলামির সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাইদি আকণ্ঠ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন, ‘তারপর বলছে কী, অ্যারপরে বলছে, আমাকে বলছে রাজাকার! আমি আমার সমস্ত শক্তি একত্র করে বলেছিলাম— শুধু হিন্দুস্তানের রাজাকারেরাই আমাকে রাজাকার বলতে পারে। শুনে রাখো, চট্টগ্রামের লক্ষ-লক্ষ জনতা— আমাকে যারা রাজাকার বলবে, তারা পিতৃপরিচয়হীন অবৈধ সন্তান। উন্নিশশো, উন্নিশশো একাত্তুর সনের; শোনো, মোছলমানেরা— উন্নিশশো একাত্তুর সনের কোনো কাদা সাইদির গায়ে লাগে নাই। আমাকে রাজাকার বলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করবা? জনগণ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। আমাকে রাজাকার বলে যদি তা কেউ প্রমাণ করতে না-পারে, তা হলে আমি দশ কোটি টাকার মানহানি-মামলা দায়ের করব।’ ওয়াজ-জগতে মিজানুর রহমানের পথপ্রদর্শক দেলাওয়ার হোসাইন সাইদি। এ-জগতে মিজানকে সাইদির সফলতম উত্তরসূরি হিশেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু মিজান রাজকারপরিচয়কে ‘অ্যাওয়ার্ড’ বলে ঘোষণা করার চব্বিশ বছর আগেই সাইদি রাজাকারপরিচয়কে অস্বীকার করে গেছেন।  নিজ ভূখণ্ডের জনগণের ওপর গণহত্যা চালানো কোনো দল যখন পরাজিত হওয়ার পঞ্চান্ন বছর পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সাজার চেষ্টা করে; তখন সেই দলের নেতাদের বক্তব্যে এভাবেই অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়, সেই দলের ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া নেতার বাবা ১৯৭১ সালে শহিদ হয়, ত্রিশ লক্ষ শহিদের হিশেব উলটে দিতে সেই দলকে প্রতিমিনিটে আশ্রয় নিতে ত্রিশ কোটি মিথ্যার।

    স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সাংবিধানিকভাবেই নিষিদ্ধ ছিল। ধর্মভিত্তিক সবগুলো রাজনৈতিক দলই মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা করেছিল বিধায় স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে আলাদাভাবে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মানেই ছিল স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা। শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবার হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং বিদেশে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদেরকে বাংলাদেশে ফিরে রাজনীতি করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের শীর্ষ স্বাধীনতাবিরোধী গোলাম আজম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন বিএনপিরই আমলে, বিএনপি একাধিক যুদ্ধাপরাধীকে মন্ত্রিত্বও দিয়েছিল, গড়ে তুলেছিল দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক জোট। জোট ভেঙে যাওয়ার পর সেই বিএনপি ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামির বিরুদ্ধে একমাত্র রাজনৈতিক অস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করেছে সেই মুক্তিযুদ্ধকেই, জামায়াতের নেতাকর্মীদেরকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিএনপি জামায়াতকে নির্বাচনের আগে মানসিকভাবে দুর্বল করেছে, করে চলছে এখনও। যে-বিএনপি স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে সবচেয়ে বেশি পুনর্বাসন করেছে এবং বাংলাদেশকে পুনর্বার ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বানানোর পথকে প্রশস্ত করেছে, সেই বিএনপিকেও একপর্যায়ে সাজতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র পরিবেশক। আজন্ম পরাজিত দল জামায়াত ২০২৬-এর নির্বাচনে প্রায় পৌনে একশো আসন পেয়ে এখন স্বপ্ন দেখছে একদিন-না-একদিন এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার এবং জামায়াত ভালোভাবেই জানে নিজেদের রাজাকারপরিচয় মুছে ফেলতে না-পারলে বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়া কখনওই সম্ভব না। এজন্যই সব রাজাকার ক্রমশ ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সাজতে শুরু করেছে, রাজাকারদের পুনর্বাসনকারীরা মুক্তিযুদ্ধের ‘একমাত্র পরিবেশক’ সাজতে শুরু করেছে, জামায়াতের যারা একাত্তরে যাদের জন্ম নেননি বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন তারা সাজতে শুরু করেছেন ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’।

    ২০২৩ সালের ১৯ মে অপর একটি রাজনৈতিক কলামে লিখেছিলাম— ‘অবিভক্ত পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে স্বাধীন বাংলাদেশরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে চেতনা, শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করেছে চেতনা, নব্য আল-বদরদেরকেও তটস্থ করে রাখছে চেতনা। যে-চেতনার ফল্গুধারা সাতচল্লিশ থেকে শুরু হয়ে আজও বিদ্যমান, আজও বহমান, আজও চলমান; একটা নির্দিষ্ট চক্র সেই চেতনাকে অপছন্দ করবে, সেই চেতনার কথা শুনলেই ঘা খেয়ে চিৎকার করে উঠবে, আর কত চেতনা বেচবেন বলে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করবে— এতে অবাক হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। যে-চেতনার বিরোধিতাকারী নেই, সেই চেতনা কোনো চেতনাই না। নির্দিষ্ট একটা শব্দ শুনেই বিরোধীকারীরা আঁতকে উঠছে— এই দৃশ্যের সাক্ষী হতে পারার মাঝেও আপাদমস্তক আনন্দ আছে। সব চক্রকে এটুকু উপলব্ধি করতে হবে— বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল সরকারগঠন করতে চাইলে তাদেরও চেতনা থাকতে হবে, বিরোধীদলে থাকতে চাইলে তাদেরও চেতনা থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে চেতনাবিহীন কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা করতে পারবে না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কটাক্ষ করলে তা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু দলীয়ভাবে বা রাজনৈতিকভাবে কোনো সংগঠন চেতনার বাইরে গেলে তাদের ধপাস-পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশে যেকোনো দলকে ক্ষমতায় থাকতে হলেও চেতনা নিয়ে কটাক্ষ করা যাবে না, বিরোধীদলে থাকলেও না; মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে, চেতনার প্রশ্নে কোনো নয়-ছয় বাংলাদেশে চলবে না। সরকারবিরোধী হওয়া যাবে, সরকারবিরোধিতার নামে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হওয়া যাবে না।’

    শাহ্‌ জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের একটি পুরোনো কলামের কিয়দংশও এখানে প্রণিধানযোগ্য— ‘যারা প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করে এই দেশটা এনে দিয়েছে; তারা যে-স্বপ্ন দেখছিল, সেটাই হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই এই দেশের রাজনীতি হোক, সুখ-দুঃখ, মান-অভিমান হোক, কোনো কিছুই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাইরে হতে পারবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রথম মাপকাঠি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। যারা এটিকে অস্বীকার করে, তাদের এই দেশে রাজনীতি করা দূরে থাকুক, এই দেশের মাটিতে পা রাখার অধিকার তাদের নেই।’

    যা হোক, সামগ্রিক ঘটনাচক্রে অন্তত এটুকু প্রতীয়মান হলো— মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রাজনীতি করতে হলে একটা-না-একটা পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের কাছেই ফিরতে হয়। তবে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি নিজেদেরকে ‘মুক্তিযোদ্ধাপরিবারের সদস্য’ বলে দাবি যত কম করবে এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা যত কম বলবে, তাদের জন্য তা ততই মঙ্গলজনক। এরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বললেই তালগোল পাকিয়ে ফেলে এবং এদের গোমর তত বেশি ফাঁস হয়ে যায়, তত বেশি সামনে এসে যায় পঞ্চান্ন বছরের পুরোনো ইতিহাস, তত বেশি উন্মোচিত হয় এদের মোনাফেকচরিত্র। আবার, কেবল মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে রাজনীতির নামে লাগামহীন লুটপাট চালালে ঘাতকপাখি আওয়ামি লিগের মতো সদলবলে পালাতে হয়, দেশে ফেরার তৃষ্ণা নিয়ে কোনো এক অলৌকিক ঘটনার জন্য অধীর অপেক্ষা করতে হয় চাতকপাখির মতো, ওয়ারিশদেরকে দেশে রেখে বিশ্বজুড়ে বেওয়ারিশ ঘুরে বেড়াতে হয় উচ্ছিষ্ট উদ্‌ভ্রান্তের মতো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে শুধু মুক্তিযুদ্ধের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাজনীতি করলে এর পরিণতিও ভয়ংকর হয়।

    মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে ইতিহাস হয় না, রাজনীতি হয় না, সাহিত্য-সংস্কৃতি হয় না। ইতিহাস থেকে যারাই মুক্তিযুদ্ধকে বিয়োগ করতে চেয়েছে, ইতিহাস তাদেরকেই বিয়োগ করে দিয়েছে অথবা মুক্তিযুদ্ধের কাছে নতজানু হতে বাধ্য করেছে, মাথা নত করতে বাধ্য করেছে জাতীয় স্মৃতিসৌধে, একুশের প্রথম প্রহরে ভাষাশহিদদের চরণতলে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে বাধ্য করেছে কেন্দ্রীয় শহিদমিনারে। মুক্তিযোদ্ধারা এখন শতায়ু, গতায়ু, মুমূর্ষু; মুক্তিযোদ্ধারা এখন শক্তিহীন। মুক্তিযুদ্ধ এখনও শক্তিমান, যেকোনো কিছুর চেয়ে শক্তিমান, স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিমান। এই শক্তির উৎস অদৃশ্য, অজানা, অসংজ্ঞায়িত।

    Share. Facebook WhatsApp Copy Link
    Previous Article৫ আগস্ট থেকে চলতি জুন: সংকট-অস্থিরতায় ৭ শিল্প এলাকায় ৪৫৭ কারখানার ৮৬% স্থায়ীভাবে বন্ধ
    Next Article শুধু বস্তুনিষ্ঠ লেখার জন‍্য পান্ডারা ছেলেটিকে মব চালিয়ে আধমরা করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়
    JoyBangla Editor

    Related Posts

     “বন্যাদুর্গত মানুষের সাথে সরকার উপহাস করছে”— বিবৃতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের

    July 14, 2026

    নকল ব্যান্ডেজ পরে আদিবাসীদের ওপর হামলাকারী সেই ইনসাফ নেতা এবার হিন্দুদের দেশছাড়ার উস্কানিতে

    July 13, 2026

    ১২ জুলাই, বহদ্দারহাট: ছাত্রলীগের ৮ নেতাকর্মীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে জঙ্গি সংগঠন শিবিরের কিলাররা

    July 13, 2026

    আগস্টেই রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে

    July 12, 2026
    Leave A Reply Cancel Reply

    সম্পাদকের পছন্দ

    আগস্টেই রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে

    July 12, 2026

    সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা  কেন বললেন, ‘আমাকে ফিরতেই হবে’

    July 11, 2026

    একাত্তরে আমেরিকা কাদের বন্ধু ছিল!

    July 9, 2026

     জুলাই আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য:  সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মডেল-অভিনেত্রীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি)

    July 6, 2026
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • TikTok
    মিস করবেন না
    Bangladesh

     “বন্যাদুর্গত মানুষের সাথে সরকার উপহাস করছে”— বিবৃতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের

    By JoyBangla EditorJuly 14, 20260

    দেশের দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলায় চলমান ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং…

    বিয়ের সাক্ষী যখন পোষা কুকুর

    July 14, 2026

    ইরানের ওপর আবারও মার্কিন নৌ অবরোধ, জাহাজ থেকে টোল নেওয়ারও ঘোষণা ট্রাম্পের

    July 14, 2026

    এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন

    July 14, 2026

    সাবস্ক্রাইব

    সর্বশেষ খবরের সাথে আপডেট থাকুন।

    About Us
    About Us

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন করে দেশ ও বিদেশের খবর পাঠকের কাছে দুত পৌছে দিতে জয় বাংলা অঙ্গিকার বদ্ধ। তাৎক্ষণিক সংবাদ শিরোনাম ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পেতে জয় বাংলা অনলাইন এর সঙ্গে থাকুন পতিদিন।

    Email Us: info@joybangla.co.uk

    Our Picks

    আগস্টেই রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে

    July 12, 2026

    সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা  কেন বললেন, ‘আমাকে ফিরতেই হবে’

    July 11, 2026

    একাত্তরে আমেরিকা কাদের বন্ধু ছিল!

    July 9, 2026

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.