বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক ভূ-স্থির স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বর্তমানে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১) আওয়ামী লীগ সরকারের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ২,৭৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্যাটেলাইট ২০১৮ সালের মে মাসে সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর থেকে দেশের টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অপতথ্য
অথচ ৫ আগস্টের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এই স্যাটেলাইটকে নিয়ে ব্যাপক অপপ্রচার চালায়। ততকালিন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এর বরাতে পত্রিকাগুলো লেখে, “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে বছরে লোকসান ৬৬ কোটি টাকা”
এটিকে ‘সাদা হাতি’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবছর বিপুল লোকসানের গল্প ছড়ানো হয়, সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এটিকে ‘আরেক সাদা হাতি’ বলে উল্লেখ করে বিটিআরসির এক শীর্ষ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়:
“আমরা জানি না কেন আমরা কোনো আর্থিক সামর্থ্য ছাড়াই জনগণের এই বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলাম…”
সংস্কার করে একবছরেই লাভজনক প্রকল্পের দাবি
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উয়িং থেকে জানানো হয়, “কক্ষপথে ছয় বছর অতিক্রমের পর বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে।”
প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১, ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণের পর প্রথমবারের মতো লাভজনক হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি তার উপলব্ধ ক্ষমতার মাত্র অর্ধেক ব্যবহার করে ৩৮.৩৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। ১ ডিসেম্বর অনুমোদিত নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)-এর রাজস্ব ৯.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৭.০৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই এসেছে সম্প্রচারকারী, ডিটিএইচ পরিষেবা, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যান্ডউইথ বিক্রি থেকে। বর্তমানে এর ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২৬টি সক্রিয় রয়েছে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন: বেরিয়ে এলো সত্য
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি উপস্থাপিত তথ্য অনুসারে, গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) স্যাটেলাইটটি থেকে মোট ১৬৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জিত হয়েছে। এ সময়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৭৬৪ কোটি ১০ লাখ টাকা।বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)-এর আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে:
২০২০-২১: ৮৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা নিট মুনাফা
২০২১-২২: ৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা
২০২২-২৩: ৭৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা নিট লোকসান (সম্পত্তি হস্তান্তরের পর অবচয়মূল্য/Depreciation অন্তর্ভুক্তির কারণে কাগজে-কলমে)
২০২৩-২৪: ২৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা নিট মুনাফা
২০২৪-২৫: ৩৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা নিট মুনাফা
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সংসদে জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে লোকসান দেখা গেলেও এটি অবচয়মূল্য অন্তর্ভুক্তির ফল। পরবর্তী বছরগুলোতে সংস্থাটি আবার মুনাফায় ফিরেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র অর্ধেক ক্ষমতা ব্যবহার করেও রাজস্ব বেড়েছে ৯.২৪ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকার এসব ইতিবাচক তথ্য গোপন রেখে শুধু লোকসানের খবর প্রচার করে আওয়ামী লীগ সরকারকে দুর্নীতিবাজ ও বেহিসাবী হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ করেও তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোতে একটি মাইলফলক। এটি সম্প্রচার, ডিটিএইচ, সামরিক ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণ করছে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি লাভজনক হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের এই দূরদর্শী বিনিয়োগ জনগণের টাকা অপচয় নয়, বরং জাতীয় অগ্রগতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।অন্তর্বর্তী সরকারের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট শুধু আকাশে নয়, বাংলাদেশের উন্নয়নের গর্ব হয়ে উজ্জ্বল থাকবে।
