লন্ডন : যুক্তরাজ্যসহ সমগ্র ইউরোপে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশি নবপ্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য-এর উদ্যোগে লন্ডনে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো দু’দিনব্যাপী ১৪তম বাংলাদেশ বইমেলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব ২০২৬।
গত ২৭ ও ২৮ জুন পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকার ব্রাডি আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লেখক, গবেষক, শিল্পী, সাহিত্যপ্রেমী এবং বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের উপস্থিতিতে উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
এবারের উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিন্তক রূপা চক্রবর্তী। বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশিষ্ট অনুবাদক আনিসুজ্জামান এবং যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি শামীম আজাদ। ২৭ জুন অতিথিবৃন্দ বেলুন উড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল এবং সাধারণ সম্পাদক উদয় শংকর দুর্জয়ের সার্বিক পরিচালনায় আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
এবারের বইমেলায় বাংলাদেশ থেকে আগত ৯টিসহ মোট ১০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি প্রকাশনীগুলো হলো: ইউপিএল, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, পরিবার প্রকাশনী, অনিন্দ্য, অন্বেষা, কবি প্রকাশনী, বাসিয়া প্রকাশনী, অভ্র এবং বুনন। এবারের মেলা উপলক্ষে মোট ৪৩টি নতুন বই প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ১৬টি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বই সম্পর্কিত তথ্য মেলার মূল মঞ্চে প্রোজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয়।
উৎসবের প্রথম দিনে “অনুবাদ ও বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিকতা” শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আনিসুজ্জামান। আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অবনী অনার্য, কবি মিল্টন রহমান এবং ভার্চুয়ালি যুক্ত হন বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষা সচিব এবং শিক্ষাবিদ গৌরাঙ্গ মোহন্ত।
দ্বিতীয় দিনে “সাহিত্যে অনুধ্যান” শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন আনিসুজ্জামান, কিংস কলেজের অধ্যাপক কেতন শেখ, অধ্যাপক অবনী অনার্য লেখক সাংবাদিক সায়েম চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা মিনহাজ কিবরিয়া এবং চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সোনিয়া। আলোচনায় সমকালীন সাহিত্যচর্চা, অনুবাদ, সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে এবং চলচ্চিত্রে কি সাহিত্যের প্রভাব নিয়ে মতবিনিময় হয়।
উৎসবে সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য চারটি ক্যাটাগরিতে সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করে। সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন কবি মাশুক ইবনে আনিস। গবেষণায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গুণীজন সম্মাননা প্রদান করা হয় বিশিষ্ট গবেষক ও ইতিহাসবিদ ফারুক আহমদকে।
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের জন্য বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় বিশিষ্ট সংগঠক ও টেলিভিশন উপস্থাপক হেনা বেগম এবং নূরজাহান শিল্পীকে। এছাড়া ডিস্টিংগুইশড ফ্রেন্ডস রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় লেখক ও সাংবাদিক শেবুল চৌধুরীকে।
উৎসবের সমাপনী দিনে রওশনা মণি-র উপস্থাপনায় একক সংগীত পরিবেশন করেন সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ড. শাহানা বাজপাই।
দু’দিনব্যাপী উৎসবে প্রতিদিনই ছিল কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পাশাপাশি ব্রিটিশ বাংলাদেশি নবপ্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে সংগঠনের সভাপতি কবি মোহাম্মদ ইকবাল রচিত দিকনির্দেশনামূলক নাটক “শেকড়ের খোঁজে” বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়।
এবারের উৎসবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ বাংলাদেশি তরুণদের সৃজনশীলতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষ্যে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভাগুলোতে। পাশাপাশি নাটক, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রভিত্তিক নতুন আয়োজন উৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করে।
প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা এই উৎসবে পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী, সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অংশগ্রহণকারী ও দর্শকদের আন্তরিক সহযোগিতায় এবারের বাংলাদেশ বইমেলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব সফল ও সার্থকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।এ ছাড়া বই বিক্রি ছিল সন্তোষ জনক। যারা ই মেলায় এসেছেন, তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেভাবে উপভোগ করেছেন, তেমনি দুহাতে বইভর্তি ব্যাগ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্টলসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে ইংরেজী ভাষায় লেখা বই নতুন প্রজন্মসহ ভিনভাষী পাঠকরা ক্রয় করেছেন আগ্রহ নিয়ে। দ্বিভাষিক বই ও শিশু উপযোগী দ্বিভাষিক এবং শিশুদের জন্য ইংরেজি বই বিক্রির তালিকায় উল্লেখ্ করার মতো ছিল।
