ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ‘শিখা অনির্বাণ’ সার্বক্ষণিকভাবে প্রজ্বলিত না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও সরকারের পক্ষ থেকে একে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট ও সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, এই সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এই পদক্ষেপকে জাতীয় চেতনার অবমূল্যায়ন এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর এজেন্ডার কাছে পরোক্ষ নতিস্বীকার হিসেবে দেখছেন।
আইএসপিআর এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সরকার যে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে, তারই অংশ হিসেবে এই প্রতীকী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ দিনগুলোতে এই আলোকশিখা নিভিয়ে রাখা হলেও সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। জাতীয় দিবসসমূহ এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় প্রথা অনুযায়ী যথাযথভাবে শিখা প্রজ্বলন করা হবে। এছাড়া, সেনানিবাসের বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত ‘শিখা চিরন্তন’ পূর্বের মতোই সার্বক্ষণিকভাবে প্রজ্বলিত রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে সরকারের এই সাশ্রয়ী ব্যাখ্যা দেশের সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
সমালোচকদের মতে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস এবং বীর শহিদদের রক্তের স্মৃতিকে কেবল কিছু পরিমাণ গ্যাস বা আর্থিক সাশ্রয়ের দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা যায় না। যেখানে রাষ্ট্রীয় অন্যান্য খাতে বিপুল অপচয় ও অব্যবস্থাপনা চলমান, সেখানে স্বাধীনতার মূল বেদীতে আঘাত করে সাশ্রয় করার যুক্তিকে অত্যন্ত দুর্বল ও অযৌক্তিক বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাধারণ সাশ্রয় নীতির বাইরে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেশের উগ্র ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা এই জাতীয় ‘অগ্নিশিখা’ প্রজ্বলনকে ধর্মীয় দোহাই দিয়ে ‘অনৈসলামিক’ আখ্যা দিয়েছিল এবং এগুলো বন্ধের জন্য ফতোয়া জারি করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে জ্বালানি সংকটের মোড়কে এই অনির্বাণ শিখা নিভিয়ে ফেলার ঘটনাকে অনেকেই সাধারণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না।
নাগরিক সমাজের একাংশের দাবি, এটি মূলত সেই উগ্রবাদী অপশক্তির মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডা পূরণের একটি ‘কৌশলগত অজুহাত’ বা তাদের সন্তুষ্ট করার পরোক্ষ প্রয়াস, যা দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিকে সংকটের মুখে ফেলবে।
কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা উন্মুক্ত আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত সংবেদনশীল এই স্থাপনাটির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের আপত্তির পর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া—কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতার অভাবকে ফুটিয়ে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই গোপনীয়তা জনমনে সন্দেহ ও ক্ষোভকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সার সামগ্রিকভাবে, ‘শিখা অনির্বাণ’ নিভিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটি সরকারি নথিপত্রে কেবলই একটি ‘প্রশাসনিক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখানো হলেও, তা দেশের জন্ম ইতিহাস এবং জাতীয় চেতনার জায়গায় একটি গভীর আঘাত তৈরি করেছে।
উগ্রবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের যে আশঙ্কা নাগরিক সমাজ করছে, তা নিরসনে এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করে বীর শহিদদের স্মৃতির এই প্রতীককে পূর্বের ন্যায় সার্বক্ষণিকভাবে প্রজ্বলিত রাখার দাবি জোরালো হচ্ছে।
