নাহিদ আকতার
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নানা আন্দোলন–অভ্যুত্থান এসেছে, কিন্তু কোনো আন্দোলনই স্বাধীনতার ভিত্তি ‘একাত্তর’-কে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করেনি। অতীতে কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়নি। কোনো অভ্যুত্থানের পর নারী-নির্যাতনকারীকে ফুলের মালায় বরণ করা হয়নি। কোনো আন্দোলনের মুখে বেগম রোকেয়া, জাহানারা ইমাম, বঙ্গবন্ধু কিংবা শহীদ জিয়াকে পদদলিত করা হয়নি।
কোনো আন্দোলনের পর মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও ম্যুরাল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়নি, ধানমন্ডি ৩২-এর মতো স্মৃতিচিহ্ন ভাঙা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতিস্তম্ভ নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রও আগে কখনো দেখা যায়নি। অথচ জুলাই-আন্দোলনের পর ঠিক সেটাই ঘটেছে। এমনকি পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে—যেন একাত্তরের মহান স্বাধীনতার মর্যাদা খর্ব করা হয়।
তাই কেউ যদি ‘চব্বিশের অভ্যুত্থান’-কে ‘সিডিআই’ বলে অভিহিত করেন, সেটাকে নিছক গালি মনে করে রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। কারণ চব্বিশকে একাত্তরের জন্য হুমকি হিসেবেই দাঁড় করানো হয়েছে। চব্বিশকে বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক ‘ফেট’ (বিভেদ) হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মতো প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে আরবি সংস্কৃতিকে বাংলার সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে জড়িত শব্দগুলো বদলে নতুন পরিভাষা আমদানি করা হয়েছে। শব্দের রাজনীতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে একাত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কৌশল নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ভারতের ষড়যন্ত্রের অংশ’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে—যা স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতি চরম অবমাননা।
জুলাই-অভ্যুত্থান প্রকৃত অর্থেই এক ধরনের উগ্র ডানপন্থী (ফার-রাইট) উত্থান ছাড়া কিছু নয়। এই উত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এক বিকল্প পরিচয়, যা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে।
অন্য কোনো অভ্যুত্থানে দেখা যায়নি যে অভ্যুত্থানকারীরা দলে দলে বিয়ে করছে (🤣), ক্ষমতা দখল করে বসে আছে, কিংবা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে। কিন্তু চব্বিশের আন্দোলনের আড়ালে মব-সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেশকে লবিং-লুটপাটের রাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল। কোনো আন্দোলনে শিক্ষকদের এভাবে লাঞ্ছিত করে জুতার মালা পরানো হয়নি, তাদের ওপর হামলা চালানো হয়নি—কিন্তু চব্বিশে তা-ই হয়েছে।
একাত্তরকে জুলাই-চব্বিশ দিয়ে প্রতিস্থাপনের যে ষড়যন্ত্র হয়েছে, তা সবাই মেনে নেবে না। কেউ না কেউ প্রতিবাদ করবেই। যতবার একাত্তরকে মুছে ফেলার চেষ্টা হবে, ততবারই কোনো না কোনো ‘শাওন’ দাঁড়িয়ে যাবে। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তার ব্যবহৃত ভাষা বা পদ্ধতি র্যাডিক্যাল মনে হতেই পারে, কিন্তু ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
