বাঙালির জীবনে সমস্ত দিক থেকে যে দৈন্যদশা ঘনিয়ে এসেছে, তার জন্য দায়ী তার সংস্কৃতির মূল শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা যায় cultural disengagement। বাঙালির দু’হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা লোকসংস্কৃতি, ১৬০০ বছরের সাহিত্য, নাটক, যাত্রাপালা, গীত— আজ সব বিলুপ্ত।
পাঠান-মোগল শাসনে সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে বিপর্যস্ত ছিল বাংলা। এই দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি কোনো উল্লেখযোগ্য শৌর্যের পরিচয় দিতে পারেনি। কিন্তু সাহিত্যে ও সংগীতে বাঙালি কবিরা চিরস্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেছেন— অমর বৈষ্ণব ও শাক্ত কবিতার মধ্যে, মঙ্গলকাব্যের মধ্যে, পদাবলী কীর্তনের মধ্যে।
উনিশ শতকের রেনেসাঁ তো পুরাতন সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন চেতনার মেলবন্ধন। যুক্তি আর শিক্ষার আলোকে মনের মুক্তি। উনিশ শতকে বাঙালি মননে বিপ্লব ঘটায় সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র, সাহিত্য, সংগীত আর রঙ্গমঞ্চ।
আমাদের যৌবনেও কলকাতায় চারটি রঙ্গমঞ্চ ছিল। কলকাতায় দুর্ভিক্ষ হয়েছে, রাষ্ট্রবিপ্লব হয়েছে, রঙ্গমঞ্চ বন্ধ হয়নি। এই সেদিনও অফিস ক্লাবগুলিতে নিয়মিত নাটক হতো। জেলায় জেলায় নাটক হতো। বাঙালির নাট্যচর্চাকে কেন্দ্র করে বৈঠকখানায় বিরাট পেইন্টার, ড্রেসার শিল্প গড়ে উঠেছিল। নাট্যচর্চাই বাংলার সংস্কৃতি ছিল। আমি নিজে সৌখিন অভিনয়ের সঙ্গে ছাত্রাবস্থা থেকে যুক্ত ছিলাম বলে এই শিল্পটি ভালো করে জানতাম।
আর ছিল বাংলার যাত্রাশিল্প। গণশিক্ষার এত বড় মাধ্যম আর নেই। বাঙালি জীবনে শৈশব থেকে মূল্যবোধের একটা স্নিগ্ধ, হালকা বাতাস আমাদের কখনই রুদ্ধশ্বাস করেনি। যাত্রা ছিল গ্রামজীবনে দক্ষিণা বাতাস।
আর ছিল কথকতা, রামায়ণগান, কবিগান, ঠাকুমার পাশে শুয়ে গল্প শোনা। আমার ঠাকুমা ছিলেন না, কিন্তু আমার মা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। বাড়িতে পড়াশোনা করে এমন পাঠাভ্যাস তৈরি করেছিলেন যে, তিনি আমায় প্রতিদিন রাতে গল্প না শোনালে আমার ঘুম আসত না। আমার কল্পনা কোথাও হারিয়ে যাওয়ার মানা মানতে শেখেনি চেতনার সেই পাখিডাকা ভোরে। আজও জীবনের শেষ রাত পর্যন্ত তা বহন করে চলেছি।
যে নদী মরুপথে ধারা হারায় না, সে কিন্তু নিজে বৃহৎ সমুদ্রের সঙ্গে মিশে সমুদ্রকে আরও স্ফীত করে। তেমনি একটা সমাজ সম্পদশালী হয়, যখন সমাজের সমস্ত মানুষের ভেতর মূল্যবোধ-চেতনার একটা ধারা প্রবাহিত হতে থাকে। তা ক্ষীণস্রোতা হতে পারে, খরস্রোতাও হতে পারে। প্রবহমানতাই বড় কথা।
চীন, জাপান, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড— যে কোনো দেশে যান, performing art-এর মধ্য দিয়ে তারা আজও তাদের ঐতিহ্যের প্রবাহমানতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। লন্ডনের সোহোর মঞ্চগুলো আজও জমজমাট। মস্কোতে, ভিয়েনাতে এখনও ক্লাসিক্যাল ব্যালে হচ্ছে। কিন্তু বাঙালির রঙ্গমঞ্চ উঠে গেল। যাত্রা vanish হয়ে গেল। সেই বিশাল বিশাল সার্কাস এখন গল্প। অসংখ্য কবি, অথচ কবিগান আর নেই। কোথায় গেলেন বাংলার লোকশিল্পীরা? ভাতাগ্রহীতা হিসেবে এখন হাজার হাজার নাম সরকারি খাতায়।
শিল্পী আছে, শিল্প নেই। রাম আছে, অযোধ্যা নেই। কে যেন “তিষ্ঠ” বলে তার ইঙ্গিতে সব সংগীত থামিয়ে দিয়েছে।
প্রতিটি জেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। এখন লাইব্রেরি আছে। বাজারে বইও প্রচুর। ঠক বেড়েছে, পাঠক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলা ছবি এখন কাল আর রাজনীতির কপোলতলে কয়েক বিন্দু নয়নের জলে ভাসছে। কোথায় গেল বাঙালির গর্ব ফুটবলের যৌবনের দিনগুলি?
বাঙালির ফুটবল, বাঙালির সিনেমা, বাঙালির লাইব্রেরি, বাঙালির শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলি কীটদষ্ট। সেই কীটের নাম রাজনীতি।
সমাজ আগে ছিল bipolar, এখন তা tripolar। ত্রিকোণ প্রেমের মতো ত্রিমূর্তি রাজনীতি আজ ডিম আর কাদা ছোড়াছুড়ির নির্লজ্জ খেলায় মাতোয়ারা।
বাংলাকে একদা মূলত পাকিস্তান বানানোর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রয়াস থেকে সেদিন যারা বাঁচিয়েছিলেন, সেই হিন্দু বাঙালিদের কাছে কৃতজ্ঞ।
আমি আমার বাংলা বিভাজন নিয়ে যে ট্রিলজি লিখেছি— ধর্মযুদ্ধ, মাতৃভূমি আর বিভাজিত— তাতে গত দু’বছর ধরে গবেষণা করে তবে বঙ্গবিভাগের নেপথ্য কাহিনি জোগাড় করেছি। এখনও কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু ফেসবুকে দেখছি, কত লোক আমার চেয়ে কত জানে! তাঁরা অম্লানবদনে তাঁদের অপছন্দের নেতাদের চরিত্রহনন করছেন। দেশবিভাগের জন্য তাঁদের দলের বিরোধী নেতাদের গাল পাড়ছেন।
একটি জাতি যখন তার সব সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যের মূলধারা থেকে আমূল উৎপাটিত হয়ে যায়, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন রাজনীতি তাদের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে। তাঁদের শিখিয়ে দেওয়া নেতাদের কথাগুলি তাঁরা তোতাপাখির মতো কপচাতে থাকেন। তাঁরা কেউ cognitive bias, কেউ authority bias-এ আক্রান্ত হন। তখন কোনো বিচার-বিশ্লেষণ না করে তাঁদের অশিক্ষা ঢাকতে সবাই ইতিহাসবেত্তা সাজেন। একেই বলে Dunning–Kruger effect। যার যত অজ্ঞতা, সে তত সবজান্তা। তাঁরা মনীষীদেরও ছাড়েন না।
কিছু মনে করবেন না, বাঙালির শিল্প চলে গিয়েছিল। হয়তো আবার কিছুটা আসবে। কিন্তু চরিত্র চলে গেলে আর আসে না। চরিত্র গঠনের সংস্কৃতি আর শিক্ষার শিকড়টাই উপড়ে গিয়েছে।
একটা বটগাছ বড় হয়ে ছায়া দিতে একশো বছর তো লাগবেই। অষ্টম-নবম শতাব্দীর মাৎস্যন্যায় কাটাতে বাঙালির একশো বছরই লেগেছিল।
ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
সাংবাদিক / লেখক
