এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ব্রিটেন পেতে চলেছে তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। গত দুই শতাব্দীর ইতিহাসে যা নজিরবিহীন। মাত্র দু’বছরের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন কিয়ার স্টারমারের। সেই পদেই এবার বসতে চলেছেন লেবার পার্টির নেতা তথা ম্যানচেস্টারের প্রাক্তন মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (Andy Burnham UK 59th Prime Minister)।
পৃথা ঘোষ
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্রিটিশ রাজনীতিতে ফের একবার বড়সড় পালাবদল। এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ব্রিটেন পেতে চলেছে তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। গত দুই শতাব্দীর ইতিহাসে যা নজিরবিহীন। মাত্র দু’বছরের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন কিয়ার স্টারমারের। সেই পদেই এবার বসতে চলেছেন লেবার পার্টির নেতা তথা ম্যানচেস্টারের প্রাক্তন মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (Andy Burnham UK 59th Prime Minister)।
শুক্রবারই লন্ডনে দলের এক বিশেষ কনফারেন্সে লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির (NEC) চেয়ারপার্সন শাবানা মাহমুদ ঘোষণা করেন, অ্যান্ডি বার্নহ্যামই হচ্ছেন শাসকদলের নতুন দলনেতা (Andy Burnham elected Labour Party leader)। ফলে আগামী সোমবারই ব্রিটেনের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করতে চলেছেন ৫৬ বছর বয়সি বার্নহ্যাম।
ঘোষণার সময় শাবানা মাহমুদের গলায় অবশ্য কিছুটা রসিকতার সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে আর কোনও সাংসদের নাম মনোনীতই হয়নি। ফলে লড়াইটা যে খুব হাড্ডাহাড্ডি ছিল, এমনটা বলা যাবে না।”
জুনেই পদত্যাগ করলেও এতদিন পদের দায়ভার সামলাচ্ছিলেন, তবে এবার ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম মেনে আগামী সোমবার বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা চার্লসের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এর ঠিক পরপরই রাজপ্রাসাদ থেকে সরকার গড়ার আমন্ত্রণ যাবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কাছে। সোমবারই বাকি আনুষ্ঠানিকতা সেরে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক চেয়ারে বসবেন তিনি। গত ১০ বছরে এই নিয়ে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে চলেছে ব্রিটেন।
বার্নহ্যামের এই উত্থানের গল্পটা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম নয়। প্রায় এক দশক আগে, লন্ডনের ক্ষমতার অলিন্দে লেবার পার্টির হয়ে টানা ২০ বছর রাজনীতি করার পর হঠাতই দলীয় রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার মোহ ত্যাগ করেছিলেন তিনি। লন্ডন ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন উত্তরের শহর ম্যানচেস্টারে। সেখানকার মেয়র পদে লড়াই করে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন তিনি। উত্তর ইংল্যান্ডের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে হয়ে ওঠেন ‘কিং অব দ্য নর্থ’।
কিন্তু ভাগ্য তাঁকে আবার লন্ডনের ক্ষমতার কেন্দ্রে টেনে আনে। মাত্র এক মাস আগে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপ-নির্বাচনে জিতে ফের সংসদে ফিরে আসেন বার্নহ্যাম। আর তার ঠিক এক মাসের মাথায়, খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিটাই চলে এল তাঁর হাতের মুঠোয়।
কেন এত দ্রুত পতন কিয়ার স্টারমারের? মাত্র দু’বছর আগেই কিন্তু বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন কিয়ার স্টারমার। কিন্তু শাসনভার নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক জনমোহিনী নীতি থেকে ইউ-টার্ন, জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচ সামলাতে না পারা এবং গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয় – স্টারমারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। দলের অন্দরেই তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ এমন চরমে পৌঁছয় যে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আর স্টারমারের এই আচমকা পতনের ফলেই কোনও সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই সরাসরি ডাউনিং স্ট্রিটের চাবিকাঠি চলে আসছে বার্নহ্যামের হাতে। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এখনও দেশবাসীর কাছে অনেকটাই পরীক্ষিত নন। তাই তাঁর ওপর প্রত্যাশার চাপও পাহাড়প্রমাণ।
ম্যানচেস্টারের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য মিল’-এর প্রতিষ্ঠাতা জোশি হেরম্যান, যিনি বছরের পর বছর ধরে বার্নহ্যামের রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তিনি বলছেন, “গোটা দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে লেবার পার্টির অন্দরের বহু কর্মী-সমর্থক অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে কেন্দ্র করে নিজেদের স্বপ্ন আর ফ্যান্টাসি বুনতে শুরু করেছেন। দেশ কীভাবে চালানো উচিত, লেবার পার্টির আদর্শ ঠিক কী হওয়া উচিত – সেইসব প্রত্যাশার পারদ বার্নহ্যাম অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন দেখার, তিনি এই গুরুভার কীভাবে সামলান।”
৫৬ বছর বয়সি বার্নহ্যামের জন্ম লিভারপুলে হলেও, তাঁর বেড়ে ওঠা উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ টেলিকমের একজন সাধারণ ইঞ্জিনিয়ার, আর মা রিসেপশনিস্ট। এক রক্ষণশীল ক্যাথলিক পরিবারে বড় হওয়া বার্নহ্যাম অবশ্য নিজেকে ‘খুব একটা ধার্মিক’ বলে দাবি করেন না। তবে তিনি মনে করেন, ছোটবেলার সেই পারিবারিক শিক্ষা এবং বাম-ঘেঁষা লেবার পার্টির আদর্শই তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি, যা তাঁকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়তে শিখিয়েছে।
বার্নহ্যাম এবং তাঁর ভাইয়েরাই ছিলেন তাঁদের পরিবারের প্রথম প্রজন্ম, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করেন। আর যেমন তেমন বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বার্নহ্যাম পড়াশোনা করেছেন ব্রিটেনের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে।
লন্ডনের এলিট সংস্কৃতির বাইরে এসে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে এখন অগ্নিপরীক্ষাই বটে।
