একসময় উপকূলের প্রত্যন্ত জনপদ মাতারবাড়ীকে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি আধুনিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার যে উন্নয়নযজ্ঞ শুরু করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সেই কর্মযজ্ঞের বর্তমান চিত্র ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ ৯ই আগস্ট, রোববার কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গিয়ে তিনি গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা জেটি, এলএনজি-এলপিজি টার্মিনালসহ বাস্তবায়নাধীন ও প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন।
শেখ হাসিনার সরকারের সময় মাতারবাড়ীকে ঘিরে নেওয়া হয়েছিল বৃহৎ ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা পরিবহন ও খালাসের অবকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ, জ্বালানি টার্মিনাল এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করে মাতারবাড়ী-মহেশখালীকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জাইকার নথিতেও মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র
সেই উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম দৃশ্যমান নিদর্শন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। বড় জাহাজে পণ্য আনা-নেওয়া, দেশের আমদানি-রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই বন্দরটির উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাইকার তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ী বন্দরের দ্বিতীয় ধাপের উন্নয়ন প্রকল্পে কনটেইনার ও সাধারণ পণ্যের জন্য বহুমুখী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অ্যাকসেস রোড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গভীর সমুদ্রবন্দর পরিদর্শনে যান। এর আগে সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে হেলিকপ্টারে করে মাতারবাড়ীতে পৌঁছান তিনি। হেলিপ্যাডে তাকে অভ্যর্থনা জানান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের সার্বিক বিষয় প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিফ করা হয়। প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কেও তাকে অবহিত করা হয়।
শেখ হাসিনার পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ থেকে বন্দর
মাতারবাড়ীর বর্তমান উন্নয়ন কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে বিদ্যুৎ ও বন্দর—দুটি অবকাঠামো, যেগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিত করেই শেখ হাসিনার সরকারের সময় বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
মাতারবাড়ীতে ৬০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিটের ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে কয়লা পরিবহনের জন্য বন্দর সুবিধা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং অ্যাকসেস রোডও প্রকল্পের অংশ করা হয়।
জাইকার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা।
রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রও পরিদর্শন করেন। প্রকল্পের প্রশাসনিক ভবনে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
কর্মকর্তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন ও পরিচালন কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা, পরিচালন দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।
প্রকল্প এলাকায় একটি নিমের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনার সরকারের সময় নেওয়া পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রকল্প হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে যুক্ত করা।
জাইকার নথিতেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে কয়লা পরিবহন বন্দর, সঞ্চালন লাইন ও অ্যাকসেস রোডকে একই প্রকল্প কাঠামোর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্প ও জ্বালানি হাব
শেখ হাসিনার উন্নয়ন পরিকল্পনায় মাতারবাড়ী শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বৃহত্তর শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
জাইকার একটি প্রস্তুতিমূলক প্রতিবেদনে মাতারবাড়ী এলাকায় ভবিষ্যতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিকস পার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে ওঠার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ, বন্দর, জ্বালানি ও শিল্প—এই চারটি খাতকে সমন্বিত করে মাতারবাড়ীকে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করার চিন্তা ছিল উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি।
সেই ধারাবাহিকতায় রোববার প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাবিত এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প ও নতুন রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত স্থান দেখানো হয়।
পরে তিনি এলপিজি, এলএনজি ও কয়লা টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকাও ঘুরে দেখেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক খান জানান, এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিত তথ্য নেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও দিকনির্দেশনা দেন।
যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা
মাতারবাড়ীর উন্নয়নযজ্ঞের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ গভীর সমুদ্রবন্দর বা শিল্পাঞ্চল তৈরি করলেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে না; বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং আঞ্চলিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ।
জাইকার বিভিন্ন নথিতে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে জাতীয় মহাসড়ক N1-এর সংযোগ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উন্নয়নকে মাতারবাড়ীসহ মহেশখালীর বড় বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে মাতারবাড়ীকে ঘিরে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা একটি বন্দর নির্মাণ নয়; বরং বন্দর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প ও যোগাযোগ—সবগুলোকে একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশে পরিণত করা।
কয়লা জেটি থেকে গভীর সমুদ্রবন্দর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরের একপর্যায়ে কয়লা জেটিও পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন।
কয়লা পরিবহন ও খালাসের জন্য যে বন্দর অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, পরবর্তীতে সেটিকে বৃহত্তর বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
জাইকার একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্মিত জাহাজ নোঙর ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধার কারণে সেখানে বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
এভাবেই শেখ হাসিনার সরকারের সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রকেন্দ্রিক অবকাঠামো ধীরে ধীরে বৃহত্তর বন্দর ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিণত হয়।
উন্নয়নের সেই মডেল এখন ভবিষ্যতের ভিত্তি
মাতারবাড়ীতে রোববারের প্রধানমন্ত্রীর সফর তাই কেবল চলমান কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার বর্তমান চিত্র—যার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে।
গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা জেটি থেকে জ্বালানি টার্মিনাল, অ্যাকসেস রোড থেকে ভবিষ্যৎ শিল্পাঞ্চল—পরস্পর সংযুক্ত এই অবকাঠামোগুলো মাতারবাড়ীকে একটি সমন্বিত বন্দর-জ্বালানি-শিল্প হাবে রূপ দেওয়ার যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তারই বাস্তব রূপ।
রোববারের পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী সেই অবকাঠামোগুলোর বর্তমান অবস্থা দেখার পাশাপাশি প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার ও সম্প্রসারণ নিয়েও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
ফলে শেখ হাসিনার সরকারের সময় মাতারবাড়ীকে ঘিরে যে উন্নয়ন মডেল তৈরি হয়েছিল, তার ওপর দাঁড়িয়েই এখন পরবর্তী পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম শামসুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং বিএনপির বিশেষ রাজনৈতিক সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
