হামিদ মোহাম্মদ
গত কিছুদিন ধরে কিছু ব্যক্তি বা সাইট থেকে একটি আলাপ জোরালো হয়ে উঠেছে। আলাপটি ‘সিলেটী’জাতি এবং সিলেটী ভাষা নিয়ে।দেশে যখন সুশাসন থাকে না কিংবা দেশকে যখন অস্বীকার করার নানা মতলব আসে, তখনই আঞ্চলিকতা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়।যাতে দেশকে টুকরো টুকরো করা যায়। এরা কারা?
আমি সিলেট লেঙ্গুয়েজ নামক সাইটে এরকম একটি বক্তব্য সম্পর্কে ‘কবিকণ্ঠ‘ সাইট থেকে একটি কমেন্ট দিই। তখনই একজন তেড়ে আসেন। তিনি আমাকে পড়াশোনার পরামর্শ দিয়ে ম্যাসেনজারে বলেন, বাঙালিরা কোথাকার জাতি? তাদের কোনো ইতিহাস আছে নাকি? যা আছে তা মুগল,তার্কিস ঐতিহ্য। ভাত খায় ইন্দনেশিয়ানরা বেশি। বাঙালিদের ভেতো বাঙালি বলা হলেও ইন্দুনেশিয়ানরা বেশি ভাত খায়। সুতরাং বাঙালিরা ভেতো জাতিও নয়। বাঙালি জাতি সম্পর্কে তুচ্চতাচ্ছিল্য করে বলতে গিয়ে বলেছেন-বাঙলা ভাষার ইতিহাস মাত্র আটারো শতকের,এর আগে নয়। সিলেটী ভাষার ইতিহাস নাকি ৬ষ্ট শতকের।আর খাদ্যাভাসও সিলেটীদের আলাদা।তারা ‘শুটকিসিরা’ খায়, ‘আখনি’ খায়।
যাহোক, এই হলো ওর বক্তব্য। অন্য লোকেরা বলছেন, মোস্তফা সেলিম সিলেটী ভাষাকে বলছেন, বাংলা ভাষার একটি উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। তারা তা মানতে নারাজ। নাগরীলিপির গবেষক মোস্তফা সেলিমকে তিরস্কার করে নানা কথা বলছেন এই ঘরানার লোকেরা। এই ঘরানার লোকেরা নাগরীলিপি সিলেটী ভাষার লিপি বলে তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নানা খোড়া যুক্তি দিয়ে দেখাচ্ছেন, বাংলার চেয়ে পুরোনো এই লিপি।
তবে এসব নানা ঐতিহাসিক যুক্তি ও গবেষণা তথ্য দিয়ে ইতিহাস গবেষক ফারুক আহমদ নিম্নলিখিত লেখাটি লিখেছেন-
‘শুধু মোস্তফা সেলিমই এ কথা প্রথম বলেননি, ১৯০৫ সাল থেকে এখন অবধি কোনো ইতিহাসবিদ বা একাডেমিক গবেষক নাগরিকে পৃথক ভাষা বলেননি। সে তালিকায় সিলেটিদের মধ্যে রয়েছেন, নাগরি লিপি ও সাহিত্য গবেষক ড. গোলাম কাদির (তিনি সম্ভবত নাগরি লিপি ও সাহিত্য নিয়ে প্রথম পিএইচডি উপাধিধারী), গবেষক অধ্যাপক আসদ্দর আলী, ডক্টর সেলু বাসিত, ডক্টর জফির সেতু, ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, ড. শ্যামল দত্ত, ড. মোহাম্মদ সাদিক, ডক্টর ইফফাত জাহান প্রমুখ শিক্ষাবিদ ও একাডেমিশিয়ান। এর বাইরেও অসংখ্য থিসিস ও বইপুস্তকে সিলেটি নাগরিকে আলাদা ভাষা বলা হয়নি।
যারা বাংলা ভাষাকে মনে করেন আমাদের ভাষা নয় তথা সিলটিদের ভাষা নয়, তারা কী জানেন না যে, প্রমিত ভাষা আসলে কোন অণ্চলের ভাষা? প্রমিত ভাষা ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালির ভায়া নয়, সেটি নদীয়া শান্তি পুরের ভাষা। তথা বর্তমান কুষ্টিয়ার ভাষা। এভাষা ও সাহিত্য বিকশিত হয়েছিল নদের চাঁদ বা নদীয়ার চাঁদ সিলেটের শ্রীচৈতন্য দেব, তার পর্ষদ এবং সিলেটি পন্ডিতদের দ্বারা। আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় যে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ হেয়েছিল তারও প্রধান ব্যক্তিরা ছিলেন সৈয়দ সুলতান ও সৈয়দ মুসা প্রমুখ সিলেটি। মোটকথা, সিলেটিদের বাদ দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশের কথা কল্পনাও করা যাবে না।
প্রমিত ভাষার বিকাশভূমি নদীয়া এখন সে আদি নামে নেই, তাই যত বিভ্রান্তি। তাও এক সিলেটির হাত ধরে নামটির পরিবর্তন। সে পরিবর্তনটাও করেছেন সিলেটি সৈয়দ মুর্তাজা আলী ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের পরে। তিনি ছিলেন নদীয়ার ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রইট। তখন নদীয়া জেলার যে অংশ পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়েছিল তারা সে অংশের নামকরণ করেন নবদ্বীপ। তখনো দুই দেশে পৃথক ডাকের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে চিঠিপত্র আদান-প্রদানে সমস্যা হত।এই যোগাযোগ সমস্যা দূর করার জন্য তিনি নদীয়া নামটি পরিবর্তন করে রাখেন কুষ্টিয়া।
শেষ কথা হচ্ছে, পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ ছাড়া মোস্তফা সেলিমের মতো নাগরিলিপি প্রেমিক বা পাগল, নাগরিতে লেখা বইয়ের সংগ্রাহক, প্রকাশক, প্রচারক ও পৃষ্ঠপোষক কী আদৌ সিলেটে কখনো ছিলেন না আছেন??’।
