(আসাদুজ্জামন নূরের জন্মদিনে শত স্ট্যাটাস, মুক্তি দাবী। লেখক আলমগীর শাহরিয়ার-এর এমনি একটি স্ট্যাটাস।)
আসাদুজ্জামানা নূর তখন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরে হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে। অনুষ্ঠানে তিনি মঞ্চে প্রধান অতিথি। প্রখ্যাত নাট্যাভিনেতা আলী যাকের দর্শকসারিতে সামনে বসে আছেন। উনাকে যখন মঞ্চে বক্তৃতা দেবার জন্য উপস্থাপক আমন্ত্রণ জানালেন তখন মন্ত্রী নূর তাঁর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে বললেন, আমি এই সভামঞ্চে মন্ত্রী হিসেবে অনেকটা পদাধিকার বলে প্রধান অতিথি হিসেবে বসে আছি কিন্তু খুব সংকোচ হচ্ছে। একজন আলী যাকের যিনি দর্শকসারি থেকে ওঠে মঞ্চে এখন বক্তৃতা দিতে আসছেন—এদেশে তিনি আমার মত মামুলি মন্ত্রীর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেউ। আজকের এই অনুষ্ঠানে বরাবরের মত তাঁকে আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাচ্ছি।
খুব কাছ থেকে শোনা কথাগুলো সেদিন খুব স্পর্শ করেছিল। এদেশে সামান্য পদ পদবী পেলে অহংকারে অনেকের মাটিতে পা পড়ে না। সাত আসমানে উড়তে থাকেন। সেখানে সিনিয়র একজন সহকর্মীর প্রতি এই সম্মান ও শ্রদ্ধা আমাদের চিরায়ত সামাজিক মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এদেশে অপদার্থ অনেক লোকজনই মন্ত্রী হন। যাদের সামনে প্রয়োজনে যেতে বাধ্য হন এক দুই ডজন মন্ত্রীর চেয়েও দেশ ও জাতির জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি। তাতে গবেট মন্ত্রী চেয়ারের ক্ষণস্থায়ী ওম, উত্তাপ ও সুখলাভ করেন। কিন্তু একজন নূর সেদিন এভাবেই উঠে সম্মান জানিয়েছিলেন আলী যাকেরকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনো রাজাকার ছানাদের আখড়া, ডিপ স্টেটের দালাল আর সাম্প্রদায়িকতার রন্ধনশালা হয়নি, দেশ ও মানুষের মুক্তি সংগ্রামের স্বপ্ন নিয়ে সংস্কৃতিচর্চা হতো, আদর্শিক ছাত্র রাজনীতি চর্চায় মুখর থাকত। আলী যাকের ছিলেন তাদেরই একজন। যিনি এদেশে একাধারে অনেক গর্ব করার মতো মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটক শুধু জমিয়ে রাখেননি, সারাজীবন সুস্থ সংস্কৃতির আলোও জ্বালিয়েছেন। এজন্য তিনি অভিনেতার চেয়েও অধিক কিছু ছিলেন। এরা ছিলেন ষাটের দশকের স্বর্ণোজ্জ্বল সেই প্রজন্ম যাদের জন্য আমরা চিরকাল গর্ব করব।
আসাদুজ্জামান নূর তাঁদেরই সুযোগ্য সহকর্মী। যিনি তাঁর অভিনয় প্রতিভা দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন কয়েক প্রজন্মকে। যে অভিনেতার “কোথাও কেউ নেই” নাটকের বাকের ভাই চরিত্রের জন্য রাস্তায় মিছিল নিয়ে বের হয় মানুষ। টেলিভিশনে ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’— তাঁর অভিনীত নাটক দেখার জন্য পথঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। পুরো দেশবাসী উন্মুখ হয়ে থাকতেন টেলিভিশন সেটের সামনে। ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেও বিটিভিতে প্রচারিত নাটক নিয়ে তুমুল আগ্রহ ছিল। শুনেছি পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত ঘরে ফিরতেন সময়মত হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ও আসাদুজ্জামান নূর অভিনীত নাটক দেখার জন্য। এমন সময়ও দেখেছে দেশবাসী। তাঁর অভিনীত “আগুনের পরশমণি” চলচ্চিত্রটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য সাংস্কৃতিক দলিল।
সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার এই আকালে, অন্ধকার সময়ে আসাদুজ্জামান নূরকে ভীষণ প্রয়োজন। জন্মদিনে ইউনূস-রাজাকার-সরকারের কারাগার বন্দি আসাদুজ্জামান নূরের অবিলম্বে মুক্তি চাই। কারাগারে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা চাই। “জাগো বাহে কোনঠে সবায়।”
