নয়াদিল্লি/কলকাতা, ৯ নভেম্বর ২০২৫: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতার মধ্যে ভারত তার সবচেয়ে কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল ‘চিকেন’স নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) ১৩ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি বৃহৎ সামরিক মহড়ার জন্য নোটিস টু এয়ারমেন (নোটাম) জারি করেছে, যা চীন, ভুটান, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর পাশাপাশি, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তিনটি নতুন সামরিক গ্যারিসন—বামুনি (ধুবড়ির কাছে), কিষেনগঞ্জ (বিহার) এবং চোপড়া (পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর)—স্থাপন করা হয়েছে, যা এই করিডোরের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চীন ও পাকিস্তানের সাথে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে, যা ভারতের জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শিলিগুড়ি করিডোর:
শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেন’স নেক’ নামে পরিচিত, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ ভূমি-স্পান (প্রস্থ মাত্র ২২ কিলোমিটার), যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য (আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়) এবং সিকিমের সাথে সংযুক্ত করে। এই করিডোরটি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং চীনের সীমান্তের মাঝখানে অবস্থিত, যা এটিকে একটি কৌশলগত চোকপয়েন্টে পরিণত করেছে। যদি এই করিডোরে কোনো হুমকি দেখা দেয়, তাহলে ভারতের প্রায় ৫ কোটি মানুষের বাসস্থান এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর মতে, এই করিডোর কোনো দুর্বলতা নয়, বরং ভারতের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা করিডোর’। সেনা প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, “চিকেন’স নেক’কে আমরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং উত্তর-পূর্বের বাহিনীগুলো দ্রুত এখানে একত্রিত হতে পারে।” এই অঞ্চলে রাফাল ফাইটার জেট, ব্রহ্মোস মিসাইল রেজিমেন্ট এবং এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করা হয়েছে, যা আকাশপথে সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
নোটাম: ১৩-২০ নভেম্বরের বৃহৎ মহড়া, উত্তর-পূর্বের আকাশপথ বন্ধ
ভারতীয় বিমানবাহিনী ৭ নভেম্বর আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড এবং মণিপুরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সারা এলাকায় একটি বৃহৎ মহড়ার জন্য নোটাম জারি করেছে। এই নোটামটি ১৩ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর, যা সিভিলিয়ান এয়ার ট্রাফিককে নিরাপদ রাখার জন্য আকাশপথ সীমাবদ্ধ করে। মহড়ায় অংশ নেবে ফাইটার জেট, এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স সিস্টেম।
এটি ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পর উত্তর-পূর্বে সবচেয়ে বড় মহড়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে, ৩১ অক্টোবর জারি নোটামে ৬টি তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে—৬ ও ২০ নভেম্বর, ৪ ও ১৮ ডিসেম্বর, ১ ও ১৫ জানুয়ারি ২০২৬—যা চীন, ভুটান, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা কভার করে। এই মহড়াগুলো শিলিগুড়ি করিডোরের দ্রুত ফোর্স মোবিলাইজেশন এবং বর্ডার ডমিন্যান্সের উপর ফোকাস করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি)-এর কাছাকাছি ক্রমবর্ধমান সামরিক কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়া।
তিন নতুন গ্যারিসন: সীমান্তে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য নতুন দুর্গ
ভারতীয় সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তীকালীনকালে তিনটি নতুন গ্যারিসন স্থাপন করেছে, যা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা বাড়াবে। এগুলো হলো:
বামুনি (ধুবড়ির কাছে, আসাম): লাচিত বর্ফুকান মিলিটারি স্টেশন নামে পরিচিত এই পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটিটি তেজপুরভিত্তিক ৪ কোর (গজরাজ কোর) এর অধীনে কাজ করবে। এটি সার্ভেইল্যান্স, এরিয়া কন্ট্রোল, কাউন্টার-ইনফিলট্রেশন এবং প্রযুক্তিগত সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেসের জন্য কেন্দ্র হবে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রস্তাবে এটি গড়ে উঠেছে, যা ঈদের সময় ধুবড়িতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরে ত্বরান্বিত হয়েছে।
কিষেনগঞ্জ (বিহার): এই ফরোয়ার্ড বেস দ্রুত ট্রুপ মুভমেন্ট এবং লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য তৈরি, যা করিডোরের মধ্যভাগে অবস্থিত।
চোপড়া (পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর): ব্রহ্মাস্ত্র কোরের অধীনে এই ঘাঁটিটি সীমান্তে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং ইন্টেলিজেন্স ইন্টিগ্রেশনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
পূর্ব কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর.সি. তিওয়ারি ৭ নভেম্বর বামুনিতে এই স্টেশনের ফাউন্ডেশন স্টোন রাখেন এবং চোপড়ায় ট্রুপস পরিদর্শন করেন। এই গ্যারিসনগুলো ৪,০৯৬ কিলোমিটার লম্বা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ফাঁক পূরণ করবে এবং বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল মনোভাব এবং চীন-পাকিস্তানের ছায়া
এই উদ্যোগগুলোর পটভূমিতে রয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনুসের সাম্প্রতিক বক্তব্য। অক্টোবরে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনা প্রধানের সাথে বৈঠকে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বকে ‘ল্যান্ডলকড’ বলে উল্লেখ করে একটি বিকৃত মানচিত্র উপহার দেন, যা ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর ধারণা তুলে ধরে। এছাড়া, ইউনুস চীনকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তুরস্কের সাথে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করছেন। এগুলো ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সতর্কতা বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের সীমান্তে ‘ত্রিশুল ২০২৫’ তিন বাহিনী মহড়া চলাকালীনও এই উত্তর-পূর্ব ফোকাস দেখিয়েছে যে ভারত দ্বি-ফ্রন্ট প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপগুলো শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং আক্রমণাত্মক—যা বাংলাদেশকে সতর্ক করবে যে ভারত আর ‘অস্পষ্ট’ প্রতিক্রিয়া দেবে না।
এই গ্যারিসনগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যেমন কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। তবে, স্থানীয়রা আশা করছেন যে এটি শান্তি বজায় রাখবে, যুদ্ধ নয়। ভারতের এই কৌশলগত পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে, যেখানে শিলিগুড়ি করিডোর আর ‘গলার কাঁটা নয়, বরং একটি ‘ইস্পাতের মেরুদণ্ড’ হয়ে উঠবে।
