বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক টানা নিম্নমুখী। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, নতুন এলসি খোলা এবং রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব সূচকের অবনতি বিনিয়োগ স্থবিরতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘায়িত মূল্যস্ফীতি, শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট এবং ডলারের তারল্য ঘাটতি।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে গত দেড় বছরে ৩৫০টির বেশি ছোটমাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে স্থানীয় উৎপাদন, আয় ও কর্মসংস্থানে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। যা দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ চাপ তৈরি করেছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইনফোড) নির্বাহী পরিচালক ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তার মতে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন সর্বনিম্ন অবস্থায়, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় স্থবির, আর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে শিল্প সম্প্রসারণের পথ সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন—যতক্ষণ পর্যন্ত একটি কার্যকর রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষণ বিনিয়োগে গতি ফিরবে না। সংকট গভীর হলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন—সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিজিএমইএ–র তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের কারণে অনেক সময় উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা দ্রুত অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।
তার মতে, মাত্র ২০ জন শ্রমিক দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ দেওয়া হলে শিল্প অস্থিতিশীল হতে পারে। তিনি আরো বলেন, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট ও অনুকূল পরিবেশের অভাবে বিনিয়োগ কমে গেছে, যার প্রভাবে বেকারত্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবরে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ৫৬৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১২.১৫% কম। এলসির বিপরীতে বিল পরিশোধও কমেছে ১১.৪৮%।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলার সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও নতুন প্রকল্পে ঝুঁকি নিতে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারিয়েছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কঠোর নজরদারির ফলে আমদানির আড়ালে অর্থপাচারও কমেছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস—২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৯%। এডিবি বলছে ৫% এবং অন্তর্রর্তী সরকার নির্ধারণ করেছে ৫.৫%।
বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করলে প্রবৃদ্ধি ৪.৮% হতে পারে। তবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাত সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বারের তুলনায় অক্টোবরে রপ্তানি আদেশ কমেছে ৩৯ কোটি ডলার। ঢাকা অঞ্চলে আদেশ কমেছে ১৫%, আর চট্টগ্রামে ২৬%। জুলাই–অক্টোবর মেয়াদে মোট রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮.৫%, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪.৫% কম। তৈরি পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধিও নিম্নমুখী।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে সরে আসছেন। গত এক মাসে ডিএসই সূচক কমেছে ৪২০ পয়েন্ট। লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ঢাকা সফর শেষে আইএমএফ জানায়, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও আর্থিক খাত সংস্কারে সাহসী পদক্ষেপ না নিলে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা শাসনব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, যুব বেকারত্ব হ্রাস ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া বেসরকারি খাতে গতি ফিরবে না।
ইএবি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতায় সময়মতো পণ্য ডেলিভারি কঠিন হয়ে পড়েছে; জরিমানা গুনতে হচ্ছে এবং ক্রেতারা বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ব্যাংকঋণের সুদহারও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ব্যবসায়ীরা এক অঙ্কে সুদহার নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এক মত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে বিনিয়োগ বাড়বে না এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে। নির্বাচনপরবর্তী নীতিগত স্পষ্টতা এলে আমদানি, এলসি খোলা ও বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
