২০২৫ সালের বাংলাদেশ যেন এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের সাক্ষী। যে দেশে একসময় মানুষ রাতে ঘুমাতে পারত নিশ্চিন্তে, সেই দেশেই এখন দিনের আলোতেও নিরাপদ নয় কেউ। মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ের ছায়া। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই বিশৃঙ্খলার পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত সেই পরিকল্পিত দাঙ্গা এবং তার মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসা অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ ব্যর্থতা।
মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে দেশের শাসনভার আসার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধসে পড়েছে সম্পূর্ণভাবে। যে জুলাই দাঙ্গার নামে বিদেশি অর্থায়নে, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের মদদে এবং সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলা হয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রের ফসল এখন ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। একটি অবৈধ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তার বৈধতার সংকট থেকেই জন্ম নেয় নৈরাজ্য। ঠিক তাই ঘটেছে বাংলাদেশে।
পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যানই বলে দেয় ভয়াবহ চিত্র। ২০২৫ সালের প্রথম এগারো মাসে হত্যা মামলা হয়েছে তিন হাজার পাঁচশ নয়টি, যা আগের বছরের তুলনায় দুইশ একাশিটি বেশি। অপহরণের মামলা বেড়েছে চারশ ছেচল্লিশটি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে চার হাজার তিনশ পঁচিশটি। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের বুক ফাটা কান্না, স্বজন হারানোর অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু এই সংখ্যাও আসল চিত্র নয়। কতশত ঘটনা যে মামলা পর্যন্ত পৌঁছায় না, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল না হয়ে হারিয়ে যায় অন্ধকারে, তার হিসাব কে রাখে?
দেশজুড়ে বেপরোয়া মব সংস্কৃতির উত্থান ঘটেছে ভয়ঙ্কররকমভাবে। তৌহিদী জনতা আর বিক্ষুব্ধ জনতার নামে দলবদ্ধ হয়ে মানুষ আক্রমণ করছে মাজার, খানকা শরিফ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম অফিস। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে দিনেদুপুরে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের এগারো মাসে গণপিটুনিতে মারা গেছেন একশ চুরাশি জন। ভাবা যায় এই সংখ্যা? একুশ শতকের বাংলাদেশে মানুষকে রাস্তায় পিটিয়ে মারা হচ্ছে, আর এই নৃশংসতার কোনো বিচার নেই।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে। হত্যাকারীরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পালিয়ে গেছে ভারতে। ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে মহাসড়কে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সামনে রাস্তার ওপর পাথর দিয়ে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে লালচাঁদ সোহাগকে। আদালত প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। এই কি সেই বাংলাদেশ যেখানে মানুষ একসময় আইনের শাসনে বিশ্বাস করত?
মাগুরায় আট বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে। নারী ও শিশুরা আর নিরাপদ নয় নিজের দেশেই। অপহরণ, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। আর এসবের মূলে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পূর্ণ ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদক্ষতা।
যে পুলিশ বাহিনী দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেই পুলিশই ঠিকমতো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আর কেন পারবে? যে সরকারের নিজেরই বৈধতা নেই, যে সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের অধীনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কীভাবে শক্তভাবে দাঁড়াবে? পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যা বলেছে, তা আসলে পুরো পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ। তারা একে “লোক দেখানো ফাঁকা বুলি” এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের সাথে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত করেছে। এর চেয়ে বড় সত্য আর কী হতে পারে?
প্রতিদিন গড়ে চারটি করে আন্দোলন হয়েছে ঢাকায়। কথায় কথায় সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের চেষ্টা। আর এসব ঘটনায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কারণ যে সরকার নিজেই অবৈধপথে ক্ষমতায় এসেছে, তারা কীভাবে অন্যদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোরতা প্রয়োগ করবে? তাদের নিজেদেরই নৈতিক অবস্থান নেই।
বিদেশি অর্থায়নে, জঙ্গি সংগঠনের মদদে এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে যারা ছিল, তারা হয়তো ভেবেছিল ক্ষমতা দখল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অবৈধ পথে আসা যে কোনো সরকারই জনগণের বিশ্বাস হারায়। আর যখন জনগণের বিশ্বাস থাকে না, তখন দেশে নেমে আসে নৈরাজ্য। ঠিক তাই ঘটেছে বাংলাদেশে।
মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি একসময় দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলতেন, তিনি এখন একটি অবৈধ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বসে আছেন ক্ষমতায়। কিন্তু তার এই সরকার দেশের মানুষকে কী দিয়েছে? নিরাপত্তা? সমৃদ্ধি? স্থিতিশীলতা? কিছুই না। উল্টো দেশকে ঠেলে দিয়েছে এক অন্ধকার গহ্বরে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ দিনদিন সংকীর্ণ হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন করছে, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি আছে কিনা এই দেশে। এই প্রশ্নটি যে একটি দেশের নাগরিককে করতে হচ্ছে, এটাই বলে দেয় দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কে, লঞ্চে, ট্রেনে দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে মানুষ। বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আর এসবের মধ্যেও সরকার ব্যস্ত নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ফন্দি আঁটতে।
জুলাই দাঙ্গার নামে যে রক্তপাত হয়েছিল, যে শহীদদের নামে ক্ষমতায় এসেছে এই সরকার, তাদের সাথেই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে পরিবর্তন আসার কথা ছিল, তার বদলে দেশ পেয়েছে আরও বেশি নৈরাজ্য, আরও বেশি অনিরাপত্তা, আরও বেশি দুর্ভোগ।
দেশের প্রতিটি স্তরে এখন বিরাজ করছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের শিকার হচ্ছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাস করছে ভয়ে। সাংস্কৃতিক কর্মীরা, সাংবাদিকরা, শিক্ষকরা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এই কি সেই সুশাসনের বাংলাদেশ যার কথা বলা হয়েছিল?
একটি দেশের নেতৃত্ব যখন অবৈধ পথে আসে, যখন বিদেশি শক্তি, জঙ্গি সংগঠন এবং সামরিক বাহিনীর মদদে ক্যু করে ক্ষমতা দখল করা হয়, তখন সেই দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটে শুধু দুর্ভোগ। বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, যে সরকার গণতান্ত্রিক বৈধতা থেকে বঞ্চিত, সে সরকার কখনোই জনগণের কল্যাণ করতে পারে না। আর ইউনূস সরকার তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে প্রতিদিন।
বাংলাদেশের মানুষ এখন বুঝতে পারছে, তাদের সাথে কত বড় প্রতারণা করা হয়েছে। পরিকল্পিত দাঙ্গার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা আসলে দেশের কোনো উপকারই করতে পারেনি। উল্টো দেশকে পৌঁছে দিয়েছে এক গভীর সংকটের মুখে। আর এই সংকটের মূল্য চুকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যারা প্রতিদিন ঘরে-বাইরে নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে বাস করছে।
