সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু
কিশোরীবেলায় কিম্বা ‘টিন’ এজে দোলের দিনে আমার দুঃখ রাখার জায়গা থাকত না। দোলের ছুটির পরে যেদিন স্কুল খুলত…সেদিন প্রায় সব বন্ধুদের গালে, মাথায়, দুহাতে গাঢ় বা হাল্কা রংয়ের প্রলেপ দেখে দুঃখে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা হত আমার। দোলে রং দেয়াদেয়ির মধ্যে একটা হালকা প্রেমের গল্পও লুকিয়ে থাকতো কারো কারো সিঁথিতে বা গালে। সেই সব রং মাখা বন্ধুদের মধ্যে আমি যেন সদ্য বৈধব্যে পা রাখা এক জনম দুখিনী। দিনেরবেলার ফ্যাকফেকে রজনীগন্ধা। কোথাও এতটুকু রং নেই শরীরে। নেই রংদার কোনও গল্প। আমার দু একজন হিন্দু বন্ধু,যাদের বেনারসের দাদু বা হাজারীবাগের ছোট্ দিদা মারা যেত…. তারাও আমার মতো ফ্যাকফেকে রজনীগন্ধা হয়ে ক্লাসে আসত।
চোখে রং ঢুকে কীভাবে চোখের চুলকোনি বেড়েই চলেছে সেসব কথা তিক্তমুখে ব্যক্ত করত অনেকে। আবার অনেকে চুলে রঙ লেগে যাওয়ার জন্য কীভাবে গোছা গোছা চুল উঠছে,সেই কাঁদুনি গাইত। তাদের সেই দুঃখগুলোকেও ভীষণ হিংসে করতাম। যখন শুনতাম রঘুদার ছুঁড়ে দেওয়া রং শাশ্বতীর গায়ে না লেগে ঝুমকির গায়ে লেগেছে তখন মনে মনে বলতাম বেশ হয়েছে!
দোল মানে কি শুধুই অনুরাগ? না। মাঝেমাঝে রাগ অভিমানে চুবচুবে হয়ে ভিজে উঠত দোল। রং মাখা মুখ বহুবার ভুল বোঝাবুঝির মুহূর্ত তৈরি করেছে।
একইরকম রঙে রঙিন দুটি মুখ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেওয়ার ফলে তিতলির বদলে হামি পেয়েছে বুল্টি।
যে তিতলি ন্যাড়াপোড়ার রাতে গাইছিল শোনো শোনো আজ কেন মন করে গুনগুন কথা যেন গান হয়ে যায়…….কথারা গান হওয়ার আগেই দুঃখে অভিমানে তিতলির গানের কথা বদলে যেত।
জানি না আজ যে আপন / কাল সে কেন পর হয়ে যায় / যে বাতাস ফোটালো ফুল/ সেই তো আবার ঝড় হয়ে যায়….
পাপাইদা হাবলুদাদের পুরোনো বাড়ির ছাদে কী সব ছাইপাশ খেয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছে, সে খবর শোনার পর থেকে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে তিন্নি। স্কুলে যাওয়ার পর সে খবর রাষ্ট্র হতে দেরি লাগেনি। ইস্ পাপাই দা এমন করতে পারল!
ফাল্গুনের বাতাস আর পূর্ণিমার চাঁদ কতো যে রাগ অনুরাগের সাক্ষী হয়ে থাকত!
কেন যে মুসলিম ধর্মে দোল খেলা হয় না!….,কেন প্রিয়জনের কপালে গোলাপী আবীর ছুঁইয়ে নিজে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠার সুযোগ নেই ….. তা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলাম বেশ কিছুদিন। তখন বেশ কটা ধর্মীয় পুস্তক প’ড়ে ইসলাম ধর্মের মূল কথাটি জানতে প্রয়াসী হয়েছিলাম। আসলে বয়সটাই তো অমন ছিল! কেন নয় আর কেন হয়….. এগুলো মাথায় ঘুরত অনবরত। ১৯৮৯ এ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেব। সেইসময় বাজারে সলমন আর ভাগ্যশ্রী ‘হিট’ দিতে এলেন। আমরাও লুফে নিলাম “ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া”। কাঁচা প্রেমে মাখো মাখো ছবির বিষয়বস্তু। সিনেমাটায় একটা গান ছিল– দিল দিওয়ানা বিন সজনাকে মানে না….. মিষ্টিমুখী ভাগ্যশ্রীর পরনে শাড়ি , মাথায় সাদা ফুলের মালা। ঠোঁটে লতা মঙ্গেশকর। দুনিয়া মাঙ্গে আপনে মুরাদে ম্যায় তো মাঙ্গু সাজন ও হো হো হো….. রহে সালামত মেরে সজনা অউর সজনাকা আঙ্গন…. গোলাপী লাল আবীর ছোড়াছুড়ি চলছে সেই সিকুয়েন্সে। নায়ক নায়িকা ছাড়া বাকি ছেলেমেয়েরা আবির ছুঁড়ে মারছে একে অন্যকে। কারো একজনের আবিরে নায়িকার মাথা এবং সিঁথি রঙে ভর্তি । নায়ক তা দেখে মনে মনে সিঁদুর লেপা নায়িকার রূপ কল্পনা করে মুগ্ধ…. আমিও মুগ্ধ। সিনেমার এই দৃশ্য বাস্তবে সাধারণ ছেলেমেয়েদের জীবনেও ঘটতো দোলে। সিঁথি টাচ করা এক চুটকি গোলাপি বা লাল আবির বদলে দিত কৈশোরের মানে। তখন অল্পবয়সে বাইরের রংয়ের কাছে মন নতজানু হতো। ওটাই মনে হতো চিরসত্য । বাইরের রঙিন ছবির অন্তরালে ধুসরের বাস কতো স্বাভাবিক হতে পারে সেটা জানা ছিল না।
তবে বাহ্যিকভাবে এই রঙ দেওয়া নেওয়ার উৎসবকে অস্বীকার করার উপায় নেই। দোল কবে কীভাবে শুরু হলো ,সে তথ্য আমাদের সকলেরই জানা। তথ্যের বাইরে চোখ মেলে চাইলে দেখা যাবে দখিনা বাতাসে চঞ্চল হয়ে নানা রঙের ফুল -পাতায় প্রকৃতি নিজেই নিজেকে রঙিন করে সাজিয়ে তুলেছে।
রান্নাঘরেও কিন্তু রঙের অভাব নেই। একেকটা মশলার একেকরকম রঙ। সবাই মাত্র দুদিন রং খ্যালে। আর বাড়ির গিন্নিরা সারাবছর রঙ মাখেন। আঁচলে। গালে, চিবুকে হলুদের হলদে রং। কপালের লাল কুমকুম গ’লেট’লে বেলা বাড়লেই হ্যাপি হোলি।
