উল্টো পথে নারীর ক্ষমতায়ন
► শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমেছে ► উচ্চশিক্ষা ও নেতৃত্বে পিছিয়ে ► বেড়েছে সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে
জিন্নাতুন নূর
একসময় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে রোল মডেল বিবেচনা করা হতো। এখন উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করেছে দেশ। জরিপ বলছে, দেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। উচ্চশিক্ষায় নারী পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে। ২৫ বছরের মধ্যে দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বেও নারীর অংশগ্রহণ এখন সবচেয়ে কম। সম্প্রতি নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বেড়েছে বাল্যবিয়ের হারও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছর দুয়েক ধরে নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো সামনে চলে এসেছে। এ অবস্থায় আজ পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক।’
শ্রমশক্তিতে নারী অংশগ্রহণ কমেছে। পারিবারিক চাপ, মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কর্মস্থলে ফিরতে না পারা, যানবাহন প্রাপ্তিতে সমস্যা, নারীবান্ধব পরিবেশের অভাবসহ বেশ কিছু কারণে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট শ্রমশক্তি ছিল ৭ দশমিক ১৭ কোটি। আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৩৪ কোটি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে মোট শ্রমশক্তি ১৭ লাখ কমেছে। যার বেশির ভাগই নারী শ্রমশক্তি হ্রাসের কারণে হয়েছে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ পদ, বিভিন্ন খাতভিত্তিক পেশায় দক্ষ শ্রমিক, গবেষক এবং সৃজনশীল কাজে নারীর উপস্থিতি এখনো হাতেগোনা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নারীদের টেকনিক্যাল এবং প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষার দিকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। আবার যেসব মেয়ে উচ্চশিক্ষার পরও বিয়ের পর সন্তান লালনপালন নিয়ে ব্যস্ত, তাদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কর্মজীবী মায়ের সন্তান প্রতিপালনে ডে-কেয়ার সুবিধা থাকতে হবে।
এ ছাড়া মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে সরকার প্রণোদনা দিয়ে যদি এ পর্যন্ত ধরে রেখে এর সঙ্গে শ্রমবাজারের সংযোগ তৈরি করতে পারে তাহলে শ্রমশক্তিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাড়বে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতেও নারী শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। এক সময়ে এ খাতে মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও জীবন চালাতে হিমশিম খেয়ে নারীরা এখন আর পোশাক কারখানার চাকরিকে আকর্ষণীয় মনে করছেন না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীরা ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, নিরাপদ পরিবহনের অভাব এবং আবাসিক হলের সংকটের জন্য উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ কমছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক স্তরে ছাত্রীর সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর ৫১ দশমিক ২১ শতাংশ। মাধ্যমিকে এই হার বেড়ে ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে এটি কমে ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৪৭ শতাংশ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীর অনুপাত যথাক্রমে ৫২ ও ৪৮ শতাংশ। বেসরকরি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কম। কারিগরি শিক্ষায়ও নারীরা অনেক পিছিয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বেও নারী অংশগ্রহণ কমেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। নির্বাচনে ৮৫ নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন। সম্প্রতি একশন এইড বাংলাদেশ এক অনুষ্ঠানে জানায়, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ গত ২৫ বছরের মধ্যে এখন সর্বনিম্ন। সংস্থাটির মতে, নির্বাচনি ব্যবস্থায় কাঠামোগত বাধা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রুদ্ধ করছে।
২০২৫ সাল ছিল নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের বছর। এ বছর ধর্ষণ এবং পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা ২০২৪ সালের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়। ধর্ষণের ঘটনা ছিল ২০২৪ সালের প্রায় দ্বিগুণ। জাতিসংঘের ইউএনএফপিএর বৈশ্বিক জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫ বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই। খুব কম বয়সে মা-ও হচ্ছেন অনেকে, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
