আফজাল হোসেন
বঙ্গদেশের মানুষ্যস্বভাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য নিয়ে দারুণ একখানা কবিতা লিখেছিলেন কবি কুসুম কুমারী দাশ।
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে,
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”
হাঁড়ির একটা ভাত টিপে রাঁধুনি বলে দিতে পারেন, পুরো হাঁড়ির ভাত কতটা সিদ্ধ হয়েছে। যার কবি মন থাকে, তাঁর পক্ষেও রান্নাঘরে বসে দুনিয়াদর্শন করা সহজেই সম্ভব হয় ।
সত্য জটিল নয়। যা সত্য এবং সহজ তা- মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকে। যে কবি সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা নেই, সেই কবে লিখে যাওয়া তাঁর কবিতার দুটো লাইন আজ পর্যন্ত অনেক মনেই গাঢ় ভাবে গেঁথে রয়েছে।
ঘরে ঘরে হ্যারিকেন, প্রদীপ জ্বলা সময়ের কবির মনে হয়েছে, এদেশে মানুষ বেশী কথা বলতে পছন্দ করে। দেশের ভালোর জন্য দরকার কাজ ভালোবাসা মানুষ।
এখন স্যুইচ না টিপে ঘরে শুয়ে বসে যদি বলি, আলো তুমি জ্বলে ওঠো, আলো জ্বলে উঠবে। যদি বলি, ফ্যান তোমার গতি বাড়াও, ফ্যান তার গতি বাড়িয়ে দেবে। মানুষ হুকুম করে বিদ্যুৎ শক্তিকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে। এসব আধুনিক হয়ে ওঠার নমুনা। জীবনে আধুনিকতা যুক্ত হচ্ছে কিন্তু প্রকৃত আধুনিক হয়ে ওঠা হচ্ছে না।
চিরকাল ধরে দেশের সিংহভাগ মানুষ ভালোর স্বপ্ন দেখে দেখে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তাদের দম ফেলার, আফসোস, দুঃখ করার ফুরসত হয় না। তারা মনে করে, অভাব অভিযোগ জীবনেরই অংশ। ওসব খাকবে, মেনে, সয়ে বাঁচতে হবে। কিচ্ছু না করে বসে হায় হায় করলে বা পরের সমালোচনায় সময়ই নষ্ট হয় কেবল।
কাজের চেয়ে কথা বলতে ভালোবাসা মানুষ সমাজে রয়েছে। এদের কাজই কাজই হচ্ছে, হা হুতাশ করা, হতাশা ছড়ানো আর বাড়ানো। জীবনভর মানুষের মন্দ, সমাজ বা দেশের মন্দ নিয়ে হালুম হুলুম করতে থাকলে, তাতে সময়, জীবন উভয়ই তেঁতো হয়। মন্দ সরাতে, ভাগাতে নিজেকেও মন্দ থেকে দূরে রাখতে হয়।
সংসদে অর্থবছরের বাজেট ঘোষনা করা হয়েছে। এখন চারদিকে কর নিয়ে কথা বলাবলি করতে শুনি। যদি মন্দ স্বভাব, মন্দ কথার উপর করারোপ করা হতো, লাভ হতো।
বিদেশ থেকে অমুক অমুক জিনিস আনলে এত শুল্ক দিতে হবে, অমুক অমুক পণ্য আনা হলে শুল্কের পরিমান এতো- এমন নিয়মের মতো অযথা মন্দ বলার, অসভ্যতা, কুৎসিত গালিগালাজ ইত্যাদি করার উপর শুল্ক আরোপ, কর দেয়ার আইন করতে পারলে ভালোই হতো।
তাতে যাবতীয় অসভ্যতা বন্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। যারা কর দিয়েও মনের আনন্দে অসভ্যতা করতে চাইবে, নিশ্চিত হওয়া যাবে, এরা দেশের নির্ভেজাল, খাঁটি অসভ্য।
এখন সারা বিশ্বে কার চেয়ে কোন মানুষ কতটা অসভ্য, তার প্রমান দেবার তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে। কয়লার মতো যাদের মনের ময়লা কোনদিনও যাবে না, তাদেরকে বেছে বেছে রপ্তানী করাও যেতো।
আমাদের দেশ থেকে নতুন রপ্তানীযোগ্য পণ্যটি হবে ষোলো আনা খাঁটি কারণ আমরা বিশেষ। চোখ রাঙানো, হামলে পড়া, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবো হুঙ্কার দিতে দিতেই অনেকের বড় হওয়া।
